জোর করে ব্যাংক মার্জার করে দিলে এর সুফল কখনোই পাওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী।
এ বিষয়ে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘একীভূতকরণ প্রক্রিয়া কেবল তখনই কার্যকর হতে পারে যখন প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী ব্যাংক মনে করবে এটি তাদের জন্য লাভজনক। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশ ব্যাংক একরকম জোর করে ৫টি ব্যাংককে মার্জার করে দিচ্ছে। যেখানে সব ব্যাংক রাজি নয়। তাই জোর করে মার্জার করে দিলে এর সুফল কখনোই পাওয়া যাবে না।’
ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘পাঁচটি বা ১০টি দুর্বল ব্যাংককে মার্জার করা হলেই যে একটা শক্তিশালী ব্যাংক হয়ে যাবে এরও কোনো ভিত্তি নেই। ব্যাংকগুলোর মূল যেসব সমস্যা আছে, সেগুলো দূর করার উদ্যোগ না নেওয়া হলে ৫০টি ব্যাংক একত্রিত করলেও কোনো লাভ হবে না। এর জন্য মূল সমস্যার সমাধান করতে হবে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সেগুলোকে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একসময়ের দুর্দশাগ্রস্ত ওরিয়েন্টাল ব্যাংক, বর্তমানে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক নামে পরিচালিত হচ্ছে। সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাংকটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক হিসেবেই পরিচালিত হয়ে আসছে, বর্তমানে যার প্রায় ৮০ শতাংশ ঋণই খেলাপি।’
সরকারি অর্থায়ন নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে এটি সরকারের অর্থের অপচয়ে পরিণত হতে পারে। তাই মার্জার প্রক্রিয়ায় সরকারি অর্থায়নকে বাস্তবসম্মত, পরিকল্পিত এবং অংশগ্রহণকারীর স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত।’
প্রসঙ্গত, পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণ (মার্জার) প্রক্রিয়া অনেকটাই চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মার্জার প্রক্রিয়া এবং ব্যাংকগুলোকে অর্থায়নের নামে বাংলাদেশ ব্যাংক যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে, তাতে অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। কেননা যে ৫টি ব্যাংককে মার্জার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার চেয়েও অনেক খারাপ অবস্থায় রয়েছে অন্য বেশ কয়েকটি ব্যাংক। তাহলে কীসের ভিত্তিতে এই ব্যাংকগুলোকে ধরে বেঁধে জোর করে মার্জারের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে, সেই বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকার পরিবর্তনের পর কয়েকটি ব্যাংক নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের মিথ্যা এবং অতিরঞ্জিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এই ব্যাংকগুলো সম্পর্কে আমানতকারীদের মধ্যে এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে আমানতকারীরা এই ব্যাংকগুলো থেকে তাদের আমানত তুলে নিয়েছে। ফলে সংকটে পড়েছে ব্যাংকগুলো। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে এই ব্যাংকগুলোকে সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু এই টাকা কী হিসাবে দেওয়া হয়েছে সেই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, একীভূতকরণের প্রায় সব কাজ শেষ করা হয়েছে। অর্থের সংস্থানের জন্য শিগগির সরকারকে চিঠি দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠিতে একীভূতকরণের পুরো প্রক্রিয়া এবং অর্থায়নের কৌশল নিয়েও প্রস্তাব থাকবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ কথা জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে যে পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণ চূড়ান্ত করা হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে- ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক।
এর মধ্যে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে না গিয়ে আলাদাভাবে চালাতে চায় এক্সিম ব্যাংক।
সম্প্রতি একীভূতকরণের আলোচনায় থাকা পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে চার ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক করেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। সেখানে এক্সিম ব্যাংককে ডাকা হয়নি।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংক একীভূতকরণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরুর ধাপ হিসেবে ধারাবাহিকভাবে এই বৈঠক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মূলত ব্যাংকগুলোকে একীভূত করতে কত টাকা প্রয়োজন হতে পারে ও পদক্ষেপগুলো কী কী হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, একীভূতকরণের জন্য প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে। এর মধ্যে সরকারের কাছে ২০ হাজার কোটি টাকা অর্থায়নের প্রস্তাব দেওয়া হবে। বাকিটা বাংলাদেশ ব্যাংক এবং উন্নয়ন সহযোগী এবং দাতাসংস্থাদের কাছ থেকে পাওয়া যায় কি না সেই বিষয়ে আলোচনা চলছে।
কোনোকিছু চূড়ান্ত হওয়ার আগেই গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ব্যাংক মার্জারের ঘোষণা দেয়। এরপর গত জুনে ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও এমডিকে নিয়ে এক বৈঠক থেকে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে এ বার্তা দেওয়া হয়। তখন বলা হয়েছিল, জুলাই মাসেই এই প্রক্রিয়া কার্যকর হবে। আর এখন বলা হচ্ছে, অক্টোবরে প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে।
এই ঘোষণার দীর্ঘ সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাজ করছে। এরই মধ্যে এসব ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তাকে ছাঁটাইও করা হয়েছে। আরও কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাই হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের মধ্যে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।
কিছু ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েও আমানত ফেরত দিতে পারছে না। আর দু-একটি ব্যাংক বলছে, মার্জারের ঘোষণার পর থেকেই গ্রাহকের আমানত তোলার চাপ বাড়ছে। সেই চাপ সামলিয়ে এখন তারা নিয়মিত কাজ পরিচালনা করতেই চাপে পড়ছে।
> ব্যাংক মার্জারের সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয়
অমিয়/