আগামী ৯-১০ মার্চ ঢাকায় আসছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল। এবারের সফরে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। এসব বৈঠকে ঋণের কিস্তি ছাড়, আর্থিক খাতের সংস্কার ও দুর্নীতি দূর করা এবং আগামী বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হবে। অর্থমন্ত্রণালয় ও এনবিআর সূত্রে এসব জানা যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগামী মাসের প্রথমভাগে আইএমএফ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে আসার কথা আছে। এবারের সফরে নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ঋণের কিস্তি ছাড় ও আগামী বাজেটের বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।’
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আইএমএফের সঙ্গে প্রথম বৈঠক হবে। এবারের বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক অমীমাংসিত ইস্যু আলোচনায় থাকবে। বিশেষ করে ঋণের বেশ কয়েকটি কিস্তি ছাড় করা হয়নি। আগেই আইএমএফ জানিয়েছে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে তারা সম্পর্ক চালিয়ে যেতে আগ্রহী।’
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘নতুন সরকারকে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। সামনে নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট। সারা দেশের মানুষ এবারের বাজেটের দিকে তাকিয়ে আছে। অনেক নির্বাচনি অঙ্গীকার এবারের বাজেটে আশা করবে সবাই। আইএমএফের অনেক সুপারিশ নির্বাচনি অঙ্গীকারের সঙ্গে সামাঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। তাই নির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধিদের আইএমএফের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।’
এনবিআর সূত্র জানায়, এবারের তিন সদস্যের আইএমএফ দলটির নেতৃত্ব দেওয়ার কথা আছে সংস্থার এশিয়া-প্যাসিফিক ডিপার্টমেন্টের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রী নিবাসনের। আইএমএফ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে, ৯ অথবা ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর এক ঘণ্টার বৈঠকের স্লট বরাদ্দের অনুরোধ জানিয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, নির্বাচিত সরকারের জন্য আগামী অর্থ বছরের বাজেট হবে প্রথম বাজেট। বর্তমান সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খননসহ এলাকাভিত্তিক শিল্পায়ন ও উন্নয়নের অঙ্গীকার করে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য আসন্ন বাজেটে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়ানোরও চাপ থাকবে। অন্যদিকে আইএমএফের ঋণ নিতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। তবে সরকার অর্থায়নের জন্য রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়বে। সরকার সমালোচনার মুখে পড়বে। এই বিশ্লেষক বলেন, তাই এবারে আইএমএফের সঙ্গে বৈঠকে সরকারকে কৌশলী হতে হবে।
এনবিআর সূত্র জানায়, আইএমএফের কাছে বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে সংস্কার উদ্যোগের অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা, অর্থ খাতের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা তুলে ধরা আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য কমানো, ঋণ ফাঁদের ঝুঁকি কমানো, আর্থিক খাতে সুশাসন বাড়ানো, আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক বেষ্টনীর আওতা বাড়ানো ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ বিয়ষগুলোও জানানো হবে।
আইএমএফের সঙ্গে এবার আরও যেসব বিষয় আলোচনায় গুরুত্ব পাবে– তা হলো রাজস্ব সংস্কার, এনবিআর পুনর্গঠন, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, পুরোপুরি বাজারভিত্তিক ডলারের বিনিময় হার চালু করা, বড় মাপের প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন।
তবে আইএমফের পক্ষ থেকে ভর্তুকি কমানোর চাপ দেওয়া হয়েছিল। এবারের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে।
২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি করে। গত বছরের জুনে আইএমএফ কর্মসূচির মেয়াদ ছয় মাস বাড়িয়ে অতিরিক্ত ৮০ কোটি ডলার যুক্ত করে। এতে মোট ঋণ প্যাকেজ দাঁড়ায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ পাঁচ কিস্তিতে মোট ৩.৬৪ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার, একই বছরের ডিসেম্বরে ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার, ২০২৪ সালের জুনে ১.১৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৫ সালের জুনে ১.৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় হয়। ফলে এখনো ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার বাকি রয়েছে। গত ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইএমএফ একটি কিস্তি ছাড় স্থগিত রাখে। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেন, ‘আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ হলে এবং বিএনপি সরকার শর্ত বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলে আগামী জুনের মধ্যে ১.৩০ বিলিয়ন ডলার পাওয়া যেতে পারে। এতে ডিসেম্বরের বকেয়া কিস্তি ও পরবর্তী নির্ধারিত কিস্তি একসঙ্গে ছাড় দেওয়া হতে পারে। যা নির্বাচিত সরকারের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় বড় ধরনের সহায়তা হবে বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।