নিজের অদম্য সাহস আর পরিশ্রম দিয়ে সাত কন্যাকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার নারী উদ্যোক্তা ফরিদা পারভীন। উপজেলার নলুয়া ইউনিয়নের তালতাল বাজারে একটি ছোট মিষ্টির দোকান দিয়ে শুরু হওয়া তার সংগ্রামের গল্প আজ অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংসারের দায়িত্ব, আর্থিক টানাপোড়েন আর সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতার মাঝেই ফরিদা পারভীনকে পথ চলতে হয়েছে। স্বামীর সীমিত আয়ে সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া ছিল কঠিন চ্যালেঞ্জ। মেয়েদের পড়ালেখা নিয়ে সমাজের মানুষের কটু কথা শুনেও তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া জীবনের অন্ধকার দূর করা সম্ভব নয়। বর্তমানে তার সাত মেয়ের মধ্যে তিন মেয়ে সংসার সামলানোর পাশাপাশি চাকরি এবং ওকালতি পড়ছেন এবং বাকি চার মেয়ে পড়ালেখা করছেন। তার একমাত্র ছেলে মিষ্টির দোকানের কাজে তাকে সহযোগিতা করেন।
জানা যায়, ফরিদা পারভীনের পৈতৃক বাড়ি চন্দনাইশ উপজেলার কাঞ্চনাবাদ ইউনিয়নের পশ্চিম এলাহাবাদ গ্রামে। তিনি ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার নলুয়া ইউনিয়নের নছরত আলীর সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ওই সময় তার স্বামী চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় দুধের ছানা সরবরাহের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে সংসার চালাতেন। একপর্যায়ে তিনি উপলব্ধি করলেন আধুনিক সমাজে অশিক্ষিত মানুষ মাত্রই মূল্যহীন। তাই সন্তানদের অবশ্যই শিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সেই বিশ্বাস থেকেই ২০১২ সালে তালতাল বাজারে স্বামী নছরত আলীকে সঙ্গে নিয়ে ছোট্ট একটি জায়গায় মক্কা-মদিনা মিষ্টি বিতান নামের মিষ্টির দোকান দেন তিনি।
আরও জানা যায়, শুরুতে বড় কোনো পুঁজি বা আধুনিক সরঞ্জাম ছিল না। নিজের ও স্বামীর হাতে তৈরি মিষ্টি, রসমালাই, ক্ষীর মালাই, টক দই, মিষ্টি দই ও ঘি বিক্রি করে যা আয় হতো তা দিয়েই তাদের সংসার চলত। প্রথম দিকে বিক্রি সীমিত হলেও ফরিদা পারভীনের আন্তরিকতা, স্বচ্ছতা এবং মানসম্মত খাবার ধীরে ধীরে ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করে। প্রতিদিন রাতে এবং ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্বামীর সঙ্গে মিষ্টি জাতীয় খাবার তৈরি আর সারা দিন দোকানে বসে সেগুলো বিক্রি, এটাই ছিল তার দৈনন্দিন জীবন। মেয়েরা তাকে এ কাজে সহায়তা করতেন।
ফরিদা বলেন, আমার বিয়ের অনেক আগে থেকে আমার স্বামী দেশের বিভিন্ন জেলায় দুধের ছানা সরবরাহ করে জীবিকা নির্বাহ করত। সেই থেকে আমি তাকে এ কাজে সহায়তা করতাম। তখন অভাবের সংসার হলেও মেয়েদের কথা চিন্তা করে ২০১২ সালে নিজেরা দোকান দেওয়ার পর এখন স্বাবলম্বী। সাধারণত আমরা দৈনিক ছয় মণ দুধ ব্যবহার করে থাকি। তবে ঈদ এবং পূজার সময় দৈনিক ৩০ থেকে ৩৫ মণ পর্যন্ত দুধের প্রয়োজন হয়। দৈনিক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বিক্রি হয়। তবে ঈদ ও পূজার সময় বিক্রি বেড়ে যায়। দোকানে থাকা আইটেমের মধ্যে ক্ষীর মালাই ও ঘি অধিক পরিমাণে বিক্রি হয়।
তিনি আরও বলেন, আমার আট ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে আর বাকি চার মেয়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে পড়ালেখা করছে। একমাত্র ছেলে দোকানের কাজে আমাদের সহায়তা করে। আমার বড় মেয়ে নাসরিন সুলতানা একটি বেসরকারি হাসপাতালের নার্স হিসেবে কর্মরত। মেজো মেয়ে শাহিদা পারভীন চন্দনাইশ উপজেলার একটি মহিলা মাদরাসায় সিনিয়র শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োজিত। সেজো মেয়ে শামীমা সুলতানা ওকালতি পড়ছে। চতুর্থ মেয়ে শাহনাজ পারভীন চট্টগ্রাম কলেজের পাশাপাশি ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড টেকনোলজি (আইএইচটি) চট্টগ্রামে রেডিওলজি বিভাগে অধ্যয়নরত। পঞ্চম মেয়ে কহিনুর আক্তার আনোয়ার সরকারি কলেজের পাশাপাশি আইএইচটি চট্টগ্রামে ডেন্টাল বিভাগে পড়ছে। ষষ্ঠ ছেলে নিয়ামত উল্লাহ আমাদের মিষ্টির দোকানে সহায়তা করে। সপ্তম মেয়ে শাহিনুর আক্তার সীতাকুণ্ড উপজেলার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে এবং অষ্টম মেয়ে রুবা খানম আমাদের গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
পরিশেষে ফরিদা পারভীন বলেন, আমার মেয়েরা কারও দয়ার ওপর নির্ভর করুক এটা আমি কোনোদিনও চাইনি। আমার স্বপ্ন ছিল তারা যেন শিক্ষিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে আজ তারা নিজেদের জায়গা তৈরি করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছুই হতে পারে না। এই সফলতার পেছনে আমার স্বামীর অনুপ্রেরণা ও অবদান অনস্বীকার্য।
সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন জসি বলেন, নারীরা চাইলেই সমাজের চিত্র বদলে দিতে পারেন এবং ঘর ও বাইরের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে পারেন। নারী উদ্যোক্তা ফরিদা পারভীন এটা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো মেয়েরা বোঝা নয়, বরং পরিবারের শক্তি এটা তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন।
উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা কানিজ ফাতেমা মৌসুমি বলেন, সরকার নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। আমরা চাই, ফরিদা পারভীনের মতো অন্য নারীরাও নিজেদের উদ্যোগে আত্মনির্ভরশীল হোক। একই সঙ্গে তিনি যেভাবে মেয়েদের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, সেটি সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা।