বন্দরের মাশুল বাড়ানোর সিদ্ধান্তে নতুন করে চাপের মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশের আমদানি- রপ্তানি খাত। চট্টগ্রাম বন্দরের বর্ধিত মাশুল নিয়ে বিপাকে ব্যবসায়ীরা। কারণ তারা এই অতিরিক্ত মাশুলকে গলার কাঁটা হিসেবে দেখছে। বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে মাশুল বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি করছেন তারা। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বিদেশি অপারেটরদের সুবিধা দিতেই মাশুল বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে ভিয়েতনামের চেয়ে খরচ ৩ গুণ বাড়বে বলে তারা মনে করছেন। এটিকে তারা সরকারের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। এতে এক দিকে বাড়বে পোশাক রপ্তানির খরচ,অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ভোগ্য পণ্যের দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে। এরপরও সরকার বর্ধিত মাশুল কার্যকরের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে। নৌ পরিবহন সচিব ইতিমধ্যে বলেছেন, মাশুল কমানোর সুযোগ নেই। বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়িয়ে লিড টাইম কমিয়ে আনতে বিদেশি অপারেটর ছাড়া উপায় নেই। ব্যবসায়ীদের আপত্তি উপেক্ষা করে গত ১৪ সেপ্টেম্বর মাশুল আদায়ের নতুন কাঠামো নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে বন্দর ব্যবহারকারীদের ব্যয় গড়ে ৪১ শতাংশ বেড়েছে। সপ্তাহখানেক পর গত ২০ সেপ্টেম্বর বর্ধিত মাশুল সরকার এক মাসের জন্য স্থগিত করে। এতে ঘোর আপত্তি জানান ব্যবসায়ীরা। এমনকি ব্যবসায়ীরা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মাশুল নির্ধারণের অনুরোধ জানান। ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলেন, সরকারের কাছ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া আসবে। অবশেষে বন্দর ব্যবহারকারীদের আপত্তি ও অনুরোধ উপেক্ষা করেই আজ মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) রাত ১২ টার পর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন বাড়তি মাশুল কার্যকর হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, এই মাশুল বাড়ানোর কারণে জাহাজ মালিকরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন। অথচ চট্টগ্রাম বন্দরে আসা অধিকাংশই বিদেশি জাহাজ। পোশাক খাতের মালিকরা একদিকে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করেন, অপরদিকে তৈরি পোশাক রপ্তানি করেন। ফলে বন্দরের মাশুল বাড়ার কারণে তারাই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন বলে জানা গেছে। এতে শ্রমিক অসন্তোষের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি শিল্প কারখানার কাঁচামালের ভোগ্য পণ্যের আমদানি খরচ বেড়ে যাবে। এতে ভোক্তা সাধারণকেও বাড়তি মূল্য দিতে হবে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে বিজিএমই থেকে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
মাশুলের বিষয়ে গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, প্রতিটি ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কনটেইনারে ৪ হাজার ৩৯৫ টাকা বেড়ে মাশুল দাঁড়াবে ১৬ হাজার ২৪৩ টাকা। প্রতিটি কনটেইনার উঠানো বা নামানোর জন্য আগে মাশুল ছিল ৪৩ দশমিক ৪০ ডলার। এখন তা বাড়িয়ে ৬৮ ডলার করা হয়েছে। কনটেইনার পণ্যে প্রতি কেজিতে আগে মাশুল দিতে হতো ১ টাকা ২৮ পয়সা। এখন বাড়তি গুনতে হবে ৪৭ পয়সা। এছাড়া বন্দর ব্যবহারের চার্জও বাড়ানো হয়েছে।
শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খাইরুল আলম সুজন খবরের কাগজকে বলেন, আমরা ব্যবসা বান্ধব পরিবেশ চাই। বন্দরের মাশুল বাড়ানোর বিষয়ে আমাদের ক্ষোভ আছে। আমরা এই মাশুল সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বাড়াতে বলেছি। কিন্তু কোনো সাড়া আসেনি। বর্ধিত এই মাশুল স্থগিত করতে হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. নঈম হাসান চৌধুরী খবরে কাগজকে বলেন, বন্দর মাশুল বাড়িয়েছে সেটা ঠিক আছে। আমরা মনে করি, একসঙ্গে ৪১ শতাংশ মাশুল বাড়ানো ঠিক হয়নি। ধাপে ধাপে বাড়ানো উচিত ছিল। তাহলে এটা সবার জন্য ভালো হতো। বাড়তি মাশুল শুধু ব্যবসায়ী নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও একটা ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। একটা চাপ তৈরি করবে।
বন্দরের মাশুল বৃদ্ধির কারণে চাপের মুখে পড়েছে আমদানি-রপ্তানি খাত। এর ফলে ভুক্তভোগী হবে ভোক্তা ও রপ্তানিকারকেরা। ছোট রপ্তানিকারকদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। বর্ধিত মাশুল কার্যকর হলে ক্রেতারা পোশাক নেবে না। তারা ভারত ও ভিয়েতনামের দিকে ঝুঁকবে। এতে করে ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই সরকারের উচিত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করা।