ভূমিকম্প-উত্তর আতঙ্কে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে অনেকেরই। গত ২১ নভেম্বর ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রবলভাবে কেঁপে ওঠে সারা দেশ। ওই ভূমিকম্পের পর ছোট মাত্রার বেশ কয়েকটি ভূকম্পন দেশজুড়ে অনুভূত হয়। এ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী। ঢাকা ও নরসিংদীর বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হতাহতদের মধ্যে অনেকে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে (প্যানিক আ্যটাক) ছোটাছুটি করতে গিয়ে আহত হন। ভূমিকম্পে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক হলের পলেস্তারা খসে পড়ে। এ ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে হল ভবন থেকে অনেক শিক্ষার্থী লাফিয়ে নিচে পড়ে মারাত্মকভাবে আহত হন।
ভূমিকম্প আতঙ্ক এখনো থেমে নেই। এ আতঙ্কে অনেকে এখন শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে বসবাসের কথা চিন্তা করছেন। সম্প্রতি ঢাকায় অনুভূত একাধিক ভূমিকম্প দেশের ঝুঁকি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং দুর্বল ভবন কাঠামোর কারণে বড় কোনো ভূমিকম্প ঘটলে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। দেশে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে মানবিক বিপর্যয় এড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো সঠিক প্রস্তুতির মাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টি ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ক্ষতি ও প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বাংলাদেশ বড় ধরনের ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় থাকা ‘মেগাথাস্ট ফল্ট’ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাবডাকশন জোনে গত ৮০০ থেকে ১ হাজার বছরের সঞ্চিত শক্তি এখনো মুক্ত হয়নি, যা বিশেষজ্ঞদের মতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক সতর্ক সংকেত।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণাপত্র প্রকাশক প্রতিষ্ঠান টেইলর অ্যান্ড ফ্রান্সিস গ্রুপ গত ১৭ নভেম্বর ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি ইন ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস ভূমিকম্প আতঙ্ক নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে ভূমিকম্পে ভুক্তভোগীদের মানসিক চাপ ও মৃত্যুভয়ের মাত্রা নিরীক্ষণ করা হয়েছে। ভূমিকম্প-উত্তর আতঙ্ক নিয়ে নানা জিজ্ঞাসায় গবেষকরা দেখেছেন, কর্মসংস্থান আয়ের স্তর এই আতঙ্কের বড় নিয়ামক। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক দুর্যোগ পরিকল্পনাও এ ভীতির একটি নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
গবেষকরা বলছেন, উচ্চমাত্রার মৃত্যুভীতি কারও কারও জীবনকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। ভূমিকম্প আতঙ্কে ভুগে মানসিক বৈকল্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনার আগে ঢাকাবাসীকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভূমিকম্পের পর আমার কাছে বেশ কয়েকজন রোগী এসেছেন। তারা সবাই প্রবল আতঙ্কে ভুগছেন। তাদের ঘুম হচ্ছে না।
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করছেন। এমন বড় একটা দুর্ঘটনার পর এটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এ আতঙ্ক যেন দীর্ঘমেয়াদি না হয় সে জন্য আমি সবাইকে পরামর্শ দিয়েছি তারা যেন নিজেদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যান। দৈনন্দিন কার্যকলাপই মানুষকে আবার তার স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেবে।
সম্প্রতি ঢাকায় অনুভূত একাধিক ভূমিকম্পের ফলে মানুষের মনোজগতের বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। মানুষ যাতে আতঙ্কগ্রস্ত না হয়ে পড়ে সে জন্য এখন থেকেই নাগরিকদের নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও পরিবারভিত্তিক জরুরি প্রস্তুতির ওপর জোর দিতে হবে। কার্যকর প্রাথমিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে একটি ভূমিকম্প-সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে এখন থেকেই কাজ করে যেতে হবে।