দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশের মাটিতে পা রাখলেন তারেক রহমান। দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার দীর্ঘদিনের নির্বাসন শেষে লন্ডন থেকে সপরিবারে দেশে ফিরলেন। তার আগমন উপলক্ষে নেতা-কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তার এ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় করে রাখতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয় বিএনপি। তাকে স্বাগত জানায় সারা দেশ থেকে আসা কয়েক লাখ নেতা-কর্মী। ২০০১ সালের নির্বাচনি প্রচারে অংশ নেওয়ার মধ্যদিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হন তারেক রহমান। ওই নির্বাচনের জোট গঠনের ক্ষেত্রে নেপথ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এরপর ২০০৭ সাল থেকে শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবন। আমরা দেখেছি, ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলে তার ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়। সে সময়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি সপরিবারে লন্ডনে যান। ২০০৯ সালে দলের পঞ্চম কাউন্সিলে তিনি দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এরপর থেকেই তিনি দল পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বেগম খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়ার পর থেকে তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। গত বছরের ৫ আগস্টে দেশে যখন রাজনৈতিক সংকট চরমে তখন তার বক্তব্য জনমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখনকার তারেক রহমানের বক্তব্য বেশ গ্রহণযোগ্য ও পরিপক্ব। বিশ্লেষকরা মনে করেন, তিনি তার বাবার মতো শক্ত হাতে ইতিবাচকভাবে বিএনপির পথনকশা তৈরি এবং সে অনুযায়ী বাস্তবায়ন করবেন। ’২৪-এর অভ্যুত্থানের পর থেকে বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা তার ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। তার ফিরে আসার মধ্যদিয়ে নেতা-কর্মীরা মনে করছেন ভবিষ্যতে নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করলে তারেক রহমানই হবেন মূল কান্ডারি। বিএনপি ৩১ দফাকে দেশ গড়ার পরিকল্পনা হিসেবে ঘোষণা করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারে যেসব প্রস্তাব ঘোষণা করেছে তার প্রায় সবই ৩১ দফায় আছে বলে বিএনপি মনে করে।
বর্তমান বাংলাদেশ এক কঠিন সময় পার করছে। জুলাই অভ্যুত্থান সামনে এসেছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। কিন্তু আমরা এই ১৪ মাসে এসে কি সেই বৈষম্য দূর করতে পেরেছি? বহুল আকাঙ্ক্ষিত অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। মানুষ আশা করেছিল দেশে সংস্কার হবে, সুস্থ স্বাভাবিকভাবে জীবন-যাপন করতে পারবে মানুষ। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পথ সুপ্রসন্ন হবে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাত ধরে দেশ থেকে সব বৈষম্য কেটে যাবে। সে সুযোগ তৈরিও হয়েছিল। কিন্তু সে উদ্দেশ্য খুব একটা বাস্তবায়িত হয়নি। সরকার রাষ্ট্র সংস্কার করতে সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল। কিন্তু সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমরা লক্ষ্য করেছি বিভিন্ন সময়ে দাবিদাওয়া নিয়ে মানুষ রাজপথ দখল করে সরকারকে এক ধরনের চাপে ফেলেছে। ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, ছায়ানট, উদীচীতে মব সৃষ্টি করে আগুন দেওয়া হয়েছে। যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, বাকস্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মূলে কুঠারাঘাত ছাড়া কিছু নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিগত সরকারের সময়ের ফ্যাসিবাদী আচরণ বর্তমান সময়ে এসে কয়েক গুণ বেশি লক্ষ্য করা যায়। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে বিনিয়োগকারীরা আশা পোষণ করছেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হলে বিনিয়োগের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে। দেশে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচন। জনগণ দীর্ঘদিন ধরে মুখিয়ে আছে বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনের জন্য। আশা করছি, তারেক রহমানের দেশে ফেরার মধ্যদিয়ে রাজনীতিতে উদার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। মব সংস্কৃতি ও বৈষম্য দূর হবে। তরুণ প্রজন্মকে সঠিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে আমরা মনে করি, দুর্নীতিমুক্ত শোষণহীন সমাজ বা রাষ্ট্রবিনির্মাণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ সঠিক ও যোগ্য নেতৃত্বকেই বেছে নেবেন। দেশের ক্রান্তিকালে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিরাপদ ও কল্যাণকর হোক, এটাই প্রত্যাশা।