ভাবসম্প্রসারণ
সুপ্রিয় ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থী বন্ধুরা, শুভেচ্ছা নিও। আজ তোমাদের বাংলা দ্বিতীয় পত্র থেকে আরও ২টি ‘ভাবসম্প্রসারণ’ নিয়ে আলোচনা করা হলো।
গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন
নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন
ভাবসম্প্রসারণ: মানবজীবনের অত্যাবশ্যকীয় দুটি উপকরণ বিদ্যা এবং সম্পদ। জীবনে চলার পথে এর গুরুত্ব অপরিসীম। যে বিদ্যা আত্মস্থ নয় এবং যে ধন অপরের কাছে সঞ্চিত তা প্রয়োজনে কোনো কাজেই আসে না। এক্ষেত্রে ধন এবং বিদ্যা কোনোটিই আমাদের সত্যিকারের সম্পদ বলে বিবেচ্য নয়।
পৃথিবীর ইতিহাস এখন অনেক পুরোনো। জীবনযাত্রাও এখন অনেক জটিল। এ জীবন চলার পথে জ্ঞান আহরণের কোনো বিকল্প নেই। কারণ, এ ক্ষুদ্র জীবনে বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সব জ্ঞান আহরণ করা সম্ভব নয়। এজন্য আমাদের গ্রন্থের সাহায্য নিতেই হবে। গ্রন্থের তথ্য অধ্যয়ন করে বাস্তবতার নিরিখে সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাস্তব জীবনে যখন কাজে লাগানো হয় তখনই সেটি প্রকৃত বিদ্যা বা জ্ঞান হয়ে ওঠে। সেই জ্ঞানই সত্যিকার অর্থে আমাদের আলোর পথ দেখায়। গ্রন্থে মানুষের চিন্তা-চেতনা, অভিজ্ঞতা, দর্শন প্রভৃতি লিপিবদ্ধ থাকে। গ্রন্থে আবদ্ধ মানব উৎকর্ষের সোনালি সাফল্যের স্বাদ গ্রহণ করতে হলে বই থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তা হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। বুঝতে হবে তার ভাষ্য, গভীরতা, মর্মার্থ। প্রচুর বই সংগ্রহ করা এবং তাকে হুবহু গলাধঃকরণ করে সেগুলো থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে না। অধীত বিদ্যা যদি বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা না যায়, জীবনের উন্নতিতে যদি তা কাজে লাগানো না যায় তবে সে বিদ্যা কখনো সার্থকতার মুখ দেখে না। এ বিদ্যা হয়তো পরীক্ষা পাস কিংবা ভালো ফলাফলে সহায়ক কিন্তু জীবন চলার পথে তা সহায়তা করে না। নিছক লোক দেখানো ডিগ্রি অর্জনের জন্য গ্রন্থের শরণাপন্ন হলে যথার্থ জ্ঞান অর্জন করা যায় না। প্রয়োজনের সময় সেসব জ্ঞান যথার্থ অর্থে প্রয়োগ করা যায় না। তেমনিভাবে ধন-সম্পদের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। বর্তমান সভ্যতার উৎকর্ষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে অর্থের কোনো বিকল্প নেই। ধন-সম্পদের সদ্ব্যবহার বিশ্বে বয়ে আনে নতুন নতুন কল্যাণবার্তা, উন্নয়নের প্রাণচাঞ্চল্যকর খবর। কিন্তু এসব কোনো কাজেই যদি সম্পদের ব্যবহার করা না যায়, তা যদি কেবল নাগালের বাইরেই থাকে, থাকে অন্যত্র স্তূপীকৃত কিংবা পরের হাতে গচ্ছিত, প্রয়োজনে যদি তা নিজের অধিকারে না থাকল তবে সে ধন থাকা না থাকা সমান কথা। কারণ পুঁথিতে যে বিদ্যা থাকে আর পরের হাতে যে ধন থাকে দুটিই সমান। দরকারের সময় সে বিদ্যা, বিদ্যা নয়। সে ধন, ধন নয়। যে বিদ্যা হৃদয়ঙ্গম করা থাকে সে জ্ঞান প্রকৃত জ্ঞান। আর যে ধন দিয়ে জরুরি মুহূর্তে প্রয়োজন মেটানো সম্ভব সেটাই সার্থক ধন।
বিদ্যা এবং ধন-সম্পদ যদি যথাযথ অবদান উপযোগী করে অর্জিত হয় তবে জীবন ও জগৎ বিকাশের ক্ষেত্রে সেসব আমাদের সত্যিকার উপকারে আসবে এবং অর্জিত হবে জীবনের সার্থকতা।
দ্বার রুদ্ধ করে দিয়ে ভ্রমটাকে রুখি
সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?
ভাবসম্প্রসারণ: মানবমনের দ্বার সব সময়ই অবারিত রাখা প্রয়োজন। খোলা মন দিয়ে বিচার বিবেচনা করেই যথার্থকে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। অন্যথা ঘটলে মানব মন স্থবির হয়ে পড়বে এবং জগৎ সংসার থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে পড়বে।
আমাদের যা কিছু আকাঙ্ক্ষিত প্রকৃতি থেকে আমরা সেটি নিষ্কণ্টক উপায়ে আহরণ করতে পারি না। সুখের সঙ্গে দুঃখের একটা যোগসূত্র থাকে। দুঃখকে অতিক্রম করেই সেই সুখের অনুভূতিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়। সত্যের আকরিক মিথ্যার নানা উপাদানের সঙ্গে মিশ্রিত থাকে। সুতরাং মিথ্যাকে পাশ কাটিয়ে সত্যকে লাভ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কোনো ভুল বা ভ্রান্ত ধারণা যেন মনে প্রবেশ করতে না পারে এ উদ্দেশ্যে যদি আমরা মনের দুয়ার বন্ধ করে রাখি তবে বাস্তবজ্ঞান মনের ভেতরে প্রবেশ করার রাস্তা খুঁজে পাবে না। তখন সে মানুষের পক্ষে সত্য উপলব্ধি করা বা সত্য জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে সঠিক পন্থা হলো জ্ঞান আহরণের জন্য মনের দুয়ার খোলা রাখা, সত্য বা মিথ্যা উভয় প্রকারের জ্ঞানই অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেওয়া এবং বিবেচনার মাধ্যমে মিথ্যাকে বর্জন করে সত্যকে হৃদয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে ধারণ করা। এক্ষেত্রে প্রয়োজন সঠিকভাবে বিবেচনাবোধ জাগ্রত করা। এ সংসারের দুর্গম পথে চলতে গেলেই আমরা পদে পদে ভুল-ভ্রান্তি করতে পারি। অভিজ্ঞতার আলোকে এসব ভুল আমরা অপনোদন করতে পারি। অবশেষে একসময় আমরা নির্ভুলভাবে পথ চলতে পারব। কিন্তু ভুলের ভয়ে যদি আমরা পথ চলাই বন্ধ করে দিই তবে সঠিক পথের সন্ধান আমরা কখনো পাব না। তেমনি দুর্ঘটনার ভয়ে আমরা যদি যাত্রাই না করি তবে গন্তব্যে পৌঁছানো কখনো সম্ভব হবে না। মহামূল্যবান খনিজ দ্রব্য সংগ্রহ করতে গেলে এটিকে যেমন আমরা বিভিন্ন অপদ্রব্যের সঙ্গে মিশ্রিত পাই সত্যও তেমনি মিথ্যা দিয়ে আবৃত থাকে। মহামূল্যবান খনিজ দ্রব্যকে বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে কারখানায় পরিশুদ্ধ করে তবেই ব্যবহার উপযোগী করা হয়। সত্যকেও তেমনি বিভিন্ন মিশ্রিত তথ্য থেকে সংগ্রহ করতে হবে এবং তাকে চিনে নিয়ে জীবনের জন্য কাজে লাগাতে হবে। মনের দ্বার রুদ্ধ করে দিলে বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই সত্যের স্বাদ আমরা কখনো পাব না।
ভ্রম আমাদের সব সময়ের সঙ্গী। এটিকে বাদ দিয়ে পথ চলা সম্ভব নয়। ভুল হবে বলে পথ চলা বন্ধ না করে হৃদয়মনকে অবারিত রেখে সত্যের সন্ধানে অগ্রসর হওয়া উচিত।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা
জাহ্নবী