গল্প : অপরিচিতা
(গত ১৩ অক্টোবর প্রকাশের পর)
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: ‘বংশে তো কোনো দোষ নাই?’ উক্তিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘অপরিচিতা’ গল্পের এ উক্তিতে মামার অভিমতে অনুপমের জন্য নির্বাচিত কনের বেশি বয়স প্রসঙ্গে এ কথা বলা হয়েছে।
বন্ধু হরিশের ঘটকালিতে অনুপমের বিয়ের কথা চলছিল। কনের পরিবার মামার পছন্দমতোই ছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটে যখন মামা শোনেন কনের বয়স ১৫। তখনকার দিনে এ বয়স বেশিই ছিল। এ কারণেই মামা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, বংশের বা মেয়ের পরিবারের কোনো সমস্যার জন্য এতদিন মেয়ের বিয়ে হয়নি, নাকি! গল্পে মামার সন্দেহবাতিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয়ের সূচনা ঘটেছিল এভাবে।
প্রশ্ন: ‘বাপ কেবলই সবুর করিতেছেন, কিন্তু মেয়ের বয়স সবুর করিতেছে না।’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘অপরিচিতা’ গল্পের এ উক্তিতে অনুপমের বিয়ের জন্য নির্বাচিত কনের বয়স সেকালের পরিপ্রেক্ষিতে বেশি হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে মেয়ের বাবার ভূমিকা সম্পর্কে এ কথা বলা হয়েছে।
অনুপমের বিয়ের জন্য হরিশের প্রস্তাবিত কনের বয়স ১৫ হলে মামা মেয়ের বংশের দোষ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। আসলে দোষ বংশে নয়, সমস্যা ছিল সমাজব্যবস্থায়। মেয়ের বাবা উচ্চমূল্যের পণ দিতে পারছিলেন না; আবার তিনি মেয়ের যোগ্য বরও চাইছিলেন। ফলে মেয়ের বিয়ে দেরিতে হচ্ছিল এবং মেয়ের বয়সও বাড়ছিল। বাবা তার মেয়ের কল্যাণের জন্যই সৎপাত্র খুঁজছিলেন, আর ওদিকে মেয়ের বয়স ক্রমেই বাড়ছিল।
আরো পড়ুন : অপরিচিতা গল্পের ৪টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, দ্বাদশ শ্রেণির বাংলা ১ম পত্র
প্রশ্ন: ‘অতএব বুঝিলাম, আমার ভাগ্যে প্রজাপতির সঙ্গে পঞ্চশরের কোনো বিরোধ নাই।’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘অপরিচিতা’ গল্পের এ উক্তিতে অনুপমের বিয়ের প্রাথমিক পর্ব সমাপ্ত হয়ে তা যে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোচ্ছিল, এমন নিশ্চয়তা থেকে এ কথা বলা হয়েছে।
অনুপমের সৌভাগ্য হয়নি তার জন্য নির্বাচিত কনে স্বচক্ষে দেখার। মামার নিষেধে সে কলকাতার বাইরে যেতে পারেনি। পিসতুতো ভাই বিনুদাদা কনে দেখে আশীর্বাদ করে আসলে অনুপম রোমান্টিক ভাবালুতায় আক্রান্ত হয়। কারণ স্বল্পভাষী বিনুদাদা যখন বলেছেন, ‘মন্দ নহে! খাঁটি সোনা বটে’ তখন অনুপমের আর সন্দেহ ছিল না এ বিয়ে নিয়ে। অদেখা অপরিচিতার জন্য হৃদয় ছুটে গিয়েছিল মদন-বাণে বিদ্ধ হয়ে। প্রজাপতিও যেন চাইছিলেন বিয়েটা হোক। এ বিয়ে না হওয়ার আর কোনো কারণ ছিল না বলেই অনুপম এমন সরস উক্তিটি করেছিলেন।
প্রশ্ন: ‘কারণ, প্রমাণ হইয়া গেছে, আমি কেহই নই।’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘অপরিচিতা’ গল্পের এ উক্তিতে বিয়ে ভেঙে দেওয়ার মুহূর্তে কনের বাবা শম্ভুনাথ সেন বর অনুপমকে কিছুই বলার প্রয়োজন বোধ না করা প্রসঙ্গে এ কথা বলা হয়েছে।
শম্ভুনাথ সেন তার হবু জামাতার ব্যক্তিত্ব, সাহস, স্বনির্ভরতার চরম দুর্বলতা দেখে হতাশ হন। বিয়ের আসরে অনুপমের মামা কনের গহনা সেকরাকে দিয়ে লজ্জাজনকভাবে একটি একটি করে পরখ করান। অনুপম ব্যক্তিত্বহীনভাবে এ ঘটনা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে দেখেছে। শম্ভুনাথ সেন এ বিষয়ে অনুপমকে প্রশ্ন করেছিলেন, অথচ সে কিছুই বলতে পারেনি। তাই এমন পরিবারে মেয়ের বিয়ে দিয়ে মেয়েকে বিপদে ফেলতে চাননি বাবা। তিনি বুঝেছিলেন অনুপম তার পরিবারে কথা বলার ক্ষমতা, যোগ্যতা, সাহস রাখে না। এ কারণেই বিয়ে ভাঙার সময় শম্ভুনাথ সেন অনুপমকে আর কিছু বলেননি।
প্রশ্ন: ‘ঠাট্টার সম্পর্কটাকে স্থায়ী করিবার ইচ্ছা আমার নাই।’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘অপরিচিতা’ গল্পের এ উক্তিতে শম্ভুনাথ সেন মেয়ের বিয়ে ভেঙে দেওয়া প্রসঙ্গে এ কথা বলেছেন।
বিয়ের আসরে কনের গহনা অর্থাৎ পণের গহনা নিয়ে পাত্র পক্ষ অর্থাৎ অনুপমের মামা কনের বাবা শম্ভুনাথ সেনকে অপমান করেন। মামা ভেবেছিলেন শম্ভুনাথ যৌতুকের গহনা হয়তো কম দিতে পারেন। তাই তিনি বিয়ের আগেই গহনা যাচাই করতে চান। শম্ভুনাথ সেন মেয়ের গা থেকে গহনা খুলে এনে দেখান এবং প্রমাণ করেন তিনি গহনা কম দেননি। বিষয়টি তার জন্য অপমানজনক ছিল। যারা বৈবাহিক সম্পর্ককে কেবল যৌতুক আদান-প্রদানের বিষয় বলে মনে করেন তাদের হাতে মেয়ে তুলে দিয়ে মেয়ের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করতে চাননি শম্ভুনাথ সেন। এ কারণেই তিনি বিয়ের আসরে বাবা হয়ে মেয়ের বিয়ে ভেঙে দেন।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক বাংলা
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা
কবীর