যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে এখন নতুন এক রাজনৈতিক লড়াই শুরু হয়েছে। এই লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে একসময়কার আমেরিকান স্বপ্ন ‘একক পরিবার বা সিঙ্গেল ফ্যামিলি হোম’। সম্প্রতি মার্কিন সিনেটে একটি বড় আবাসন বিল পাস হয়েছে, যার লক্ষ্য হলো বড় বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর হাত থেকে সাধারণ মানুষের ঘর পাওয়ার সুযোগ রক্ষা করা। তবে এই বিলটি নিয়ে এখন দেখা দিয়েছে তীব্র বিতর্ক। একদিকে মালিকপক্ষ ও রাজনীতিবিদরা মনে করছেন ঘরগুলো মানুষের মালিকানায় থাকা উচিত, অন্যদিকে ভাড়াটেরা বলছেন আকাশচুম্বী দামের বাজারে এই একক বাড়িতে ভাড়া থাকার সুযোগই তাদের একমাত্র ভরসা।
অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ফিনিক্স শহরের বাসিন্দা ৭২ বছর বয়সী মোনা তার ৯৪ বছর বয়সী মাকে নিয়ে একটি তিন বেডরুমের বাড়িতে ভাড়া থাকেন। মাসে ২৫০০ ডলার ভাড়ার এই বাড়িতে আছে বারান্দা ও বাগান। মোনার কাছে এই বাড়িটি আশীর্বাদের মতো। কারণ বয়সের ভারে তিনি আর বহুতল অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়ি ভাঙতে চান না, আবার বর্তমান বাজারে বাড়ি কেনার সামর্থ্যও তার নেই। মোনার মতো লাখ লাখ মানুষের জন্য এই ‘বিল্ড-টু-রেন্ট’ বা ভাড়া দেওয়ার জন্যই তৈরি করা বাড়িগুলো এখন বড় সমাধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রতি ১০টি নতুন সিঙ্গেল বাড়ির মধ্যে মাত্র একটি তৈরি হচ্ছে ভাড়া দেওয়ার জন্য।
কিন্তু মার্কিন কংগ্রেসের নতুন হাউজিং প্যাকেজ এই ব্যবস্থায় বাদ সেধেছে। গত মাসে সিনেটে পাস হওয়া এই বিলে একটি বিশেষ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যেসব বড় বিনিয়োগকারী বা প্রতিষ্ঠানের হাতে ৩৫০টির বেশি সিঙ্গেল বাড়ি আছে, তারা নতুন কোনো বাড়ি তৈরির সাত বছর পর সেগুলো ব্যক্তিগতভাবে বিক্রি করে দিতে বাধ্য থাকবে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় পক্ষের নেতারাই এই বিলের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, ‘আমেরিকা কোনো ভাড়াটে জাতি হতে পারে না, বাড়ি তৈরি করা হয় মানুষের জন্য, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার জন্য নয়।’
বিনিয়োগকারীদের সমালোচকরা বলছেন, বড় বড় কোম্পানিগুলো যখন পাইকারি হারে বাড়ি কিনে নেয় বা তৈরি করে, তখন সাধারণ পরিবারগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। এর ফলে সাধারণ মানুষের সম্পদ জমানোর প্রধান উদ্দেশ্য ‘ঘর কেনা’ অসম্ভব হয়ে পড়ছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ বন্ধ করে দিলে বছরে অন্তত ৭২ হাজার নতুন ঘর তৈরির কাজ থমকে যেতে পারে। ইতোমধ্যে ফ্যানি মে এবং ফ্রেডি ম্যাকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই খাতের নতুন ঋণের আবেদন আটকে দিয়েছে।
আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, ভাড়া দেওয়ার জন্য তৈরি বাড়িগুলো সাধারণ বাড়ির মতো নয়। এগুলো কিছুটা ছোট হয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধার্থে মেঝেতে কার্পেটের বদলে বিশেষ টাইলস ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া পুরো একটি বিশাল জমিতে একসঙ্গে অনেকগুলো বাড়ি নির্মাণ করা হয়। সাত বছর পর প্রতিটি বাড়ি আলাদা করে বিক্রি করা প্রযুক্তিগত ও আইনিভাবে প্রায় অসম্ভব। যারা বাড়ি কেনার জন্য পর্যাপ্ত ডাউন পেমেন্ট বা ক্রেডিট স্কোর জোগাড় করতে পারছেন না, তাদের জন্য এই কমিউনিটিগুলোই একমাত্র আশ্রয়। সেডি মরিন নামে এক মা জানান, চারটি সন্তান ও তিনটি কুকুর নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে থাকা ছিল নরক যন্ত্রণার মতো। এখন মাসে ২৭০০ ডলারে একক বাড়িতে ভাড়া থেকে তিনি শান্তি পাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতে নিজের বাড়ি কেনার জন্য টাকা জমাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন রাজনীতি এখন এক কঠিন মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে মধ্যবিত্তের বাড়ি কেনার স্বপ্ন পূরণ করতে বড় পুঁজিকে আটকাতে চাইছে সরকার, অন্যদিকে সেই কড়াকড়ির ফলে ভাড়াটেদের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও অনিশ্চিত হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। মালিকানা বনাম ভাড়ার এই লড়াই শেষ পর্যন্ত মার্কিন আবাসন বাজারের ভবিষ্যৎ কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। সূত্র: সিএনএন