অন্য দিনগুলোর মতোই শুক্রবার (১ মে) সারাটি দিন সাধারণ হতে পারত। কিন্তু বিশেষ এক কারণে আমার জীবনে এ দিনটি আর দশটি দিনের থেকে আলাদা হয়ে গেল। না ছিল অফিসে যাওয়ার তাড়া, না ছিল অফিস থেকে ফিরে ক্লান্তি মোচনের চেষ্টা বা অজানা ভীতি। ঘরের আর কাজের জায়গার নিয়মিত অনুভবগুলোও কেমন দূরে সরে রইল সেদিন আলগোছে। কেবল হৃদয়ের কাছে–মনের একেবারে গভীরে স্থির হয়ে রইল একটি অনুভব; চিরদিনের চেনা সে উপলব্ধি আমার!
আগে থেকেই ছুটি নিয়ে রেখেছিলাম এই দিনটির জন্য। বিকেল ৬টায় স্কারবরোর সেন্ট পলস ইউনাইটেড চার্চে যেতে হবে–সুব্রত কুমার দাস সংকলিত ও সম্পাদিত ‘কানাডায় একাত্তর বাঙালির অভিজ্ঞতা’ গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসবে। এই সংকলনে ৭১জন লেখকের মধ্যে আমিও একজন; আমার প্রায় চারদশকের কানাডা প্রবাস-জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছি: ‘কেবল ব্যক্তি-স্বাধীনতা নয়, ব্যক্তি-নির্ভরতারও দেশ কানাডা’।
নতুন বই, আমিও একজন সংকলিত লেখক, অনেক লেখকের সাথে দেখা হবে, তাড়া সে সবের জন্য নয়–এই গ্রন্থটি কবি, সাংবাদিক, চিত্রশিল্পী, রন্ধনশিল্পী, কথাশিল্পী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ইকবাল হাসানকে উৎসর্গ করা হয়েছে, সে জন্যে আমার ভেতরের তাড়না। এবং সেই সুবাদে কবির সহধর্মিণী হিসেবে আমাকে অনুষ্ঠানে অনুভূতি প্রকাশের জন্য অনুরোধ করেছেন সম্পাদক এবং প্রকাশনা উৎসবের আয়োজক; সে কারণে তো উত্তেজনা, প্রকাশ-না-করা বেদনা এবং সংশয় ছিলই!
ঘুম থেকে উঠেই শুক্রবারের সকালবেলাটায় আচ্ছন্ন হয়ে রইলাম ইকবালের কল্পনায়; আমার জীবনের এক মহা অনুষঙ্গ এই মানুষটি। টরন্টোতে বাংলা সাহিত্য-শিল্পের চর্চা ও বিকাশে তার যে কত ভাবনা ছিল, তা বলে শেষ করার মতো নয়। এই টরন্টোর গত চার-পাঁচ দশকে বসবাসকারী বাঙালি লেখক-কবিরা তো বটেই এমনকি বাংলাদেশ-ভারত থেকে বেড়াতে আসা লেখক-শিল্পীদেরও আশ্রয়স্থল বা আয়েশের ঠিকানা ছিল কবি ইকবাল হাসান।
সেইসব দিন কেমন আবছা আলোর মতো মনে ভিড় করছিল। আনন্দে মনটা ভরে উঠছিল বটে; কিন্তু আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে যাচ্ছিল এক নীরব বেদনার নদী–যে নদীতে শুধুই আমিই স্নান করতে পারি একাকী!
সন্ধ্যা ছয়টায় নির্ধারিত ও আমন্ত্রিত অতিথিদের আসার কথা থাকলেও আয়োজনের টুকিটাকির জন্য আমাকে হাজির হতে হলো বিকেল পাঁচটার আগেই।
সুব্রত-নীলিমা দম্পতির উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার এনআরবি টিভির সিইও, সাপ্তাহিক বাংলা মেইল পত্রিকার সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিন্টুর সুস্বাদু খাবারে আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে প্রকাশনা উৎসবটি যে আনন্দঘন ও জমজমাট হয়ে উঠেছিল, তা আমার মতো সমাগত সবাই হয়তো স্বীকার করবেন।
হলরুমের প্রবেশপথে সুব্রত কুমার দাসের প্রকাশিত গ্রন্থের প্রদর্শনী ও বিক্রয়ের স্টল আয়োজনের নান্দনিকতাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল বিশেষ মাত্রায়।
এত বড় এক আয়োজনের জন্য প্রথমেই আমি আমার প্রিয় লেখক-গবেষক-শিক্ষক সুব্রত কুমার দাসকে ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা, স্যালুট ও ভালোবাসা জানাতে চাই। তার কঠোর পরিশ্রম আর আন্তরিকতার ফলে আমরা কানাডার প্রায় দুইশত বাঙালি একত্রিত হতে পেরেছিলাম। এ যাবতকালে কানাডায় আর কোনো ব্যক্তি ‘কানাডায় একাত্তর বাঙালির অভিজ্ঞতার মতো এমন একটি বিশাল পরিকল্পনা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন কি-না, তা আমার জানা নেই।
নানাবিধ বিষয় সুব্রতদা’র মাথায় কাজ করে– এমনটি আমার মনে হয়েছে। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও বহুমুখী প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব।
অনুষ্ঠানের অন্য আকর্ষণ ছিল টরন্টোর চারজন পোয়েট লরিয়েট–লিলিয়ান আ্যলেন, এএফ মরিৎজ, অ্যান মাইকেল এবং জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক-এর উপস্থিতি। তাদের সরব উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত এবং সাফল্যমণ্ডিত করেছে। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো–একটি বিশেষ গ্রন্থের প্রকাশনাকে ঘিরে লেখক-কবি-শিল্পীরা প্রাণের মেলায় মিলিত হয়েছিল যেন! আর এই অনুষ্ঠানের পর্ব-বিন্যাস এবং উপস্থাপনা ছিল অসাধারণ।
প্রথমপর্বে সম্পাদক নিজে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেছেন; আমন্ত্রিত অতিথিদেরকে তিনি পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। দ্বিতীয় পর্বটি পরিচালনা করেন টরন্টোর পরিচিতমুখ লেখক, উপস্থাপিকা প্রিয়দর্শিনী তাসমিনা খান এবং সুদর্শন উপস্থাপক মাহবুব ওসমানী।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ড. ইখতিয়ার ওমরের উপস্থিতি, অভিভাষণ এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন সভাকে বিশেষভাবে তাৎপর্যমণ্ডিত করেছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
হলরুমে সামনের সারিতে বসে অপেক্ষা করছিলাম সেই ক্ষণটির জন্য; কোলাহলের ভেতরেও আমার অনুভবে ছিল ইকবাল হাসান। মঞ্চে বিশিষ্ট অতিথিবর্গের সাথে দাঁড়িয়ে গ্রন্থের সম্পাদক যখন বলছিলেন, ‘এই বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে বাংলা ভাষার বিশিষ্ট কবি ও কথাসাহিত্যিক এবং এই টরন্টো শহরে বাংলা কবিতা ও শিল্পের বিকাশের অগ্রগণ্য ব্যক্তি ইকবাল হাসানকে’, তখন সত্যিই আমার মনে হচ্ছিল এই সভাঘরে কবি ইকবাল হাসান আছে; মনে হলো ইকবাল বেঁচে আছে কবিতার কল্পনার ভেতরে; সে টিকে আছে বাংলাদেশি-কানাডিয়ানদের অভিজ্ঞতা-প্রকাশের মধ্যে।
মঞ্চে আমাকে ডাকা হলো উৎসর্গ-বিষয়ক অভিব্যক্তি-মন্তব্য করার জন্য। এত মানুষের ভিড়ে, আমার প্রিয় বন্ধু-জীবনসাথী ইকবাল হাসানের প্রতি মানুষের সত্যিকারের ভালোবাসায় আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম। কয়দিন আগে থেকে যা যা বলবো বলে সাজিয়ে রেখেছিলাম সবকিছু গুলিয়ে গেল মুহূর্তে। আমি আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম অন্ধকারের নিবিড় আলোয়; ইকবালের ছায়া যেন আমার সামনে এসে ভেসে বেড়াচ্ছিল পুরো হলরুম জুড়ে!
কানাডিয়ান পোয়েট লরিয়েটদের চমৎকার জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য এই প্রকাশনা উৎসবকে যে অনন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে, তা ছিল টরন্টোর বাঙালি কমিউনিটির জন্য বিশেষ প্রাপ্তি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তাদের আগ্রহ সত্যিই আমাদের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে। টরন্টোর চারজন পোয়েট লরিয়েট এবং কানাডার মূলধারার আরো কয়েকজন প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিক-অধ্যাপকের আগমন এবং শুভেচ্ছা বক্তব্যে ছিল বাংলা ভাষা ও বাঙালির প্রতি মায়া; এই মমতাই তাদেরকে বাঙালির সাথে বন্ধুপ্রতীম সম্পর্ক তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
এই প্রকাশনা অনুষ্ঠানটির আরেকটি বিশেষ দিক হলো–টরন্টোর বাইরে থেকে আসা কবি-লেখকদেরকে মঞ্চে ডেকে আলাদাভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তাদেরকে ফুলেল শুভেচ্ছা জ্ঞাপন। এমন উদ্যোগ অবশ্যই ব্যতিক্রমী এবং উৎসাহ-ব্যঞ্জক। দূর-দূরান্ত থেকে লোকেরা অনুষ্ঠান-আয়োজনে যোগ দিয়ে পথের ক্লান্তি ভুলে যেতে পারে আয়োজকদের এমন মায়ায়। তারা ব্যয়বহুল ও সময়-বিনিয়োগের কষ্টগুলোও ভুলে সবার সাথে আনন্দ শেয়ার করতে পারেন। মঞ্চে আহ্বান জানানোতে তারা বিশেষভাবে সম্মানিতও বোধ করেন নিশ্চয়ই।
প্রবাস থেকে নিজ মাতৃভাষায় এমন সুবৃহৎ বই সম্পাদনার ও প্রকাশনার কাজটি একেবারেই সহজ নয়; বিশেষ করে লেখক নির্বাচন, লেখা সংগ্রহ, সম্পাদনা, প্রকাশনা ও পরিবহন (কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশ থেকে বই আনা) ব্যয় বহন করা, অনুষ্ঠানের হলরুমের ভাড়া, উপহার সামগ্রী প্রদান, আলোকচিত্র ও ভিডিও ধারণ এবং সম্পাদনা, প্রচার-প্রকাশনা, অতিথিদের আপ্যায়ন–সবকিছু মিলিয়ে অনেক ঝক্কি-ঝামেলার কাজ এটি। সম্পাদকের ভালোবাসার কথা বাদ দিলেও এখানে অবশ্যই সম্পৃক্ত থাকে পৃষ্ঠপোষকদের আন্তরিকতা। এমন বিপুল ঝুঁকি সামলে নিতে মায়ার হাত প্রসারিত করেছেন টরন্টোর কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে আছেন ব্যারিস্টার সূর্য চক্রবর্তী, ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্ট মনিষ পাল, রাজনীতিবিদ মোর্শেদ নিজাম এবং রিয়েলটর বজলুর মারুফ।
সমাজসেবকদের এমন অকৃত্রিম মমতার কারণেই বাঙালি কমিউনিটি শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক নানান অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারছে। আয়োজনটির মিডিয়া পার্টনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে এনআরবি টিভি ও সাপ্তাহিক বাংলা মেইল; এই টিভি ও পত্রিকার কর্ণধার শহিদুল ইসলাম মিন্টু সার্বক্ষণিকভাবে অনুষ্ঠানের দেখ-ভাল করেছেন; এটা শুধু কর্তব্যের কারণে নয়–লেখক-কবিদের প্রতি মায়ায়ও বটে।
কানাডার প্রিয়মুখ ও স্বজন, কবি ইকবাল হাসানের অত্যন্ত স্নেহভাজন মিন্টুর প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। ফটোগ্রাফির দায়িত্বে ছিলেন টরন্টোর প্রখ্যাত ক্যামেরা-কারিগর দীপক সূত্রধর। তাকে কাছে পেলে সবাই যেন নতুন করে ছবি তোলার জন্য ভিড় জমায়। দীপকের ছবির হাত খুব ভালো।
সুন্দর-সফল আয়োজনটি ঘিরে বলার কথা অনেক। অল্প কথায় বলতে গেলে প্রায় বিচ্যুতিবিহীন এক অনুষ্ঠান উপভোগ করার সুযোগ হলো কানাডা প্রবাসী বাঙালির। যদিও শেষপর্যন্ত এটিকে বাঙালি-কানাডিয়ান লেখকদের সম্মিলিত আয়োজন বলেই মনে হয়েছে।
বইটির শিরোনামের দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে, সম্পাদক ৫০ কিংবা ১০০ কে প্রাধান্য না দিয়ে ৭১ সংখ্যাটিকে বেছে নিয়েছেন; এখানেও রয়েছে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য ও অহংকারের ছায়া! শেকড়কে ভুলে ভাষার প্রতি, সাহিত্যের প্রতি মায়ার মুখ খোলা রাখা যায় না।
গ্রন্থের উৎসর্গপত্রটি নিশ্চয়ই টরন্টো তথা কানাডার বাঙালি সাহিত্য-অভিযাত্রার ঐতিহ্যকেই নির্দেশ করে। আর, অনুষ্ঠানের দিনটি–পহেলা মে। মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের তাৎপর্য তো সবার মনে নদীর জলের ধারার মতোই সেদিন বহমান ছিল; লেখকরাও তো একপ্রকারের শ্রমজীবীই বটে।
একদিকে কবি ইকবাল হাসানের ছায়া, অন্যদিকে ভাষার প্রতি বাঙালি লেখক-কবি-সাহিত্যপ্রেমিদের মায়া–এই দুয়ে মিলে শুক্রবারের সন্ধ্যার প্রকাশনা উৎসবটি আমার জীবনের এক অনবদ্য অংশ হয়ে রয়ে গেল।
বইটি ঢাকা থেকে প্রকাশ করেছে রয়েল পাবলিকেশন্স।
তসলিমা হাসান: কানাডার টরন্টো প্রবাসী লেখক।