বারবার চাকরি পরিবর্তন করার ভালো-মন্দ দুই দিকই আছে। তাই চাকরি পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তা আপনার ক্যারিয়ারকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে তা আগেই চিন্তাভাবনা করা উচিত।
জেনে নিন নিয়মিত চাকরি পাল্টানোর সুবিধা ও অসুবিধাগুলো-
চাকরি পরিবর্তনের সুবিধা
উপার্জন বৃদ্ধি: অনেকের মতে যেসব কর্মী একই কোম্পানিতে দুই বছরের বেশি চাকরি করেন তাদের বেতন অন্যদের থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ কম হয়। দ্রুত চাকরি পরিবর্তন করা যেমন আপনাকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ দেবে, তেমনি আপনার উপার্জনও দ্রুত বাড়াবে।
নতুন নতুন স্কিল অর্জন: চাকরি পরিবর্তনের অন্যতম একটি ভালো দিক হচ্ছে এটা আপনাকে নতুন নতুন জিনিস শেখার সুযোগ করে দেবে। নতুন কিছু স্কিল আপনাকে চাকরির বাজারে এগিয়ে রাখবে।
নিয়মিতভাবে কোম্পানি ও কাজের পরিবেশ পরিবর্তনের মাধ্যমে আপনি নিজের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে এবং স্কিলগুলোকে আরও ধারালো করতে সক্ষম হবেন। পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রির যাবতীয় তথ্য ও সাম্প্রতিক ট্রেন্ড সম্পর্কে ধারণা রাখায়ও সাহায্য পাবেন।
কাজের উৎসাহ বৃদ্ধি: চাকরি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আপনার কাজের পরিবেশ এবং দায়িত্বেও পরিবর্তন আসবে। ফলে কাজের উৎসাহ বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া নতুন চাকরিতে ঢুকলে সেখানে মানিয়ে নেওয়ার একটি চাপ থাকবে। যে পরিবেশে আপনি গত এক বছর কাজ করে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন তার থেকে পরিবেশটা হবে অনেকটা আলাদা, আলাদা হবেন আপনার উচ্চতর কর্মকর্তারাও। তাই আপনার ওপর ভালো পারফর্ম করার চাপ তুলনামূলক বেশি থাকবে এবং কাজের মাত্রাও বেড়ে যাবে।
পরিচিত পরিবেশের বাইরে গিয়ে কাজ: একই পজিশনে দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে অনেক সময় আমরা তাতে অভ্যস্ত হয়ে যাই। চাকরির পরিবর্তন সেই অভ্যস্ততা থেকে বের হয়ে ভিন্ন ও নতুন কিছু উপভোগ করার সুযোগ করে দেয়। অন্যরকম পরিবেশ ও ভিন্ন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষদের মাঝে কাজ করার সুযোগ আপনার আত্মমর্যাদা বাড়াতে এবং চাকরিক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে সাহায্য করবে।
প্রফেশনাল নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি: নতুন চাকরি মানেই নতুন সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ। নিয়মিত চাকরি পরিবর্তন আপনাকে একটি বিশাল প্রফেশনাল নেটওয়ার্ক গড়ার সুযোগ করে দেবে। যা পরবর্তী সময়ে চাকরি খোঁজাসহ আরও অনেক সমস্যা সমাধানে আপনার কাজে লাগবে। তবে এই নেটওয়ার্ক ধরে রাখার জন্য সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। চাকরি ছাড়ার সময় কারও সঙ্গে কোনো ধরনের খারাপ আচরণ করা যাবে না।
চাকরি পরিবর্তনের অসুবিধা
প্রত্যেকবার নতুন করে শুরু করা: নতুন জায়গায় চাকরি করা মানে আপনাকে সবকিছুই নতুন করে শুরু করতে হবে। কোম্পানির সংস্কৃতি ও কার্যপদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হতে হবে, নতুন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, নতুন প্রজেক্টের কাজ বুঝে নিতে হবে এবং প্রয়োজনে আপনার দৈনন্দিন রুটিনেও পরিবর্তন আনতে হবে। এসব কিছুর পাশাপাশি টিমের নতুন সদস্য হিসেবে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে আপনাকে পরিশ্রমও করতে হবে আগের চেয়ে বেশি। প্রমোশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়াটাও আপনার জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
সিভি দুর্বল হয়ে পরা: কিছুদিন পরপর চাকরি পরিবর্তন করলে সাধারণত একটি পজিশনে থেকে বড় কোনো সাফল্য অর্জন করা যায় না। নিজের সাফল্য না থাকায় এবং সিভিতে সেটা উপস্থাপন করতে না পারায় একই চাকরিতে আবেদন করা অন্যদের তুলনায় আপনার সিভি দুর্বল হতে পারে। বারবার চাকরি পাল্টানোর এবং পূর্ববর্তী চাকরি ছেড়ে দেওয়ার যথাযথ কারণ প্রদর্শন খুবই জরুরি। সেই কারণটা শুধু বেতনের পার্থক্য না হয়ে আরও কিছু হলে ভালো হয়।
ভরসা না রাখা: যেকোনো প্রতিষ্ঠানে নতুন চাকরিজীবী নিয়োগ দেওয়া অনেকটাই সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। কারণ, একজন কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিতে ও কোম্পানির কার্যপদ্ধতিতে পুরোপুরি অভ্যস্ত করতে অনেক সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে হয়। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার ছয় মাস পরেই যদি আপনি অন্য কোম্পানিতে চলে যান, তাহলে আপনার পেছনে এই খরচটা করায় তাদের কোনো লাভ থাকবে না।
তাই কারও যদি এক চাকরিতে ১৮ মাসের বেশি থাকার নজির না থাকে, হায়ারিং ম্যানেজাররা সাধারণত তাদের প্রাধান্য দেন না। এমনো হতে পারে যে অনেক জায়গায় আপনি ইন্টারভিউয়ের সুযোগও পাচ্ছেন না এই কারণে।
জ্ঞানের গভীরতার স্বল্পতা: আপনার যোগ্যতা বৈচিত্র্যময় হলেও একটা নতুন কোম্পানিতে কাজ শুরু করার সময় আপনাকে নতুন জিনিস শিখতে হবেই। দীর্ঘদিন এক জায়গায় চাকরি করলে সেই কোম্পানির কার্যপদ্ধতি ও বাণিজ্যিক মডেল সম্পর্কে যে বিশেষজ্ঞতা তৈরি হয়, তা বারবার চাকরি পরিবর্তন থেকে পাওয়া সম্ভব নয়।
টেকনিক্যাল জ্ঞানের ক্ষেত্রেও এটা একই ভাবে সত্যি। একটি প্রজেক্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করলে আপনি সেই প্রজেক্ট ও এতে ব্যবহৃত স্কিলগুলোয় অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারবেন। মাঝপথে অন্য প্রজেক্টে চলে গেলে যা হয়তো সম্ভব না।
আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি: চাকরি খোঁজা, ইন্টারভিউ দেওয়া, নতুন কোম্পানিতে মানিয়ে নেওয়া অথবা কোনো ইন্টারভিউ থেকে প্রত্যাখ্যান হওয়া– সবই মানসিকভাবে মেনে নেওয়া কঠিন। প্রতিটি ধাপেই অনেক পরিশ্রম ও সংকল্প নিয়ে লেগে থাকতে হয়।
বারবার চাকরি পরিবর্তন করতে গেলে কাজটা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। যার ফলস্বরূপ চাকরি খোঁজা ও ইন্টারভিউ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় আপনার আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
চাকরি ছাড়ার পর পূর্ববর্তী কোম্পানি ও সহকর্মীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখা এবং কোম্পানি পরিবর্তনের জন্য যথাযথ কারণ থাকা আবশ্যক। আপনার ক্যারিয়ারের লক্ষ্য কী এবং চাকরির পরিবর্তন সেই পথে আপনাকে সাহায্য করবে কি না, তা ভেবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে-চাকরির পরিবর্তন মানে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দেরও পরিবর্তন। জীবনকে সঠিকভাবে মেলে ধরতে হলে ভেবে-চিন্তে এগিয়ে যাওয়া উচিত।
তারেক