দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। এর অধিকাংশই এখনো ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে। ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করেছে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বা এমএফএস। বর্তমানে এই এমএফএস খাতের গ্রাহক ২৪ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। বিকাশমান এই খাতটির সম্ভাবনা, প্রতিবন্ধকতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মৃত্তিকা সাহা।
খবরের কাগজ: মোবাইল ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে কিছু বলুন।
ইফতেখারুজ্জামান: বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং অত্যন্ত বিকাশমান একটি খাত হিসেবে অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। বিশেষ করে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তবে নীতি কাঠামোর দুর্বলতা, সুনির্দিষ্ট কলাকৌশল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর কর ভূমিকার অভাবে বিকাশমান এই খাতটিতে কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। এতে বিগত কতৃত্ববাদী সরকারের আমলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যাপক প্রচার এবং প্রসারের সময়ে অপব্যবহার বেশি হয়েছে। তারা নিজেরাই খাতটিকে এমনভাবে করায়ত্ত করেছে, যা খাতটিকে প্রতিযোগিতামূলক করার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি করেছে।এ জন্য সঠিক নীতি কাঠামো বা আইন প্রণয়ন দরকার। যার মাধ্যমে এটি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এক্ষেত্রে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকেই এই নীতি কাঠামো তৈরি করে দিতে হবে। আর মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে সেগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
খবরের কাগজ: ব্যাংকের তুলনায় এমএফএসে খরচ কয়েকগুণ বেশি। তারপরও কেন মানুষ এই খাতে লেনদেন করছে?
ইফতেখারুজ্জামান: সম্প্রতি এই বিষয়ে আমাদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এমএফএস খাতে গ্রাহকদের সেবা পেতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের থেকে প্রায় ৭-১৫ গুণ বেশি সেবামূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। ২০২৪ সালে সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা ‘ক্যাশআউটের’ ক্ষেত্রে গ্রাহকদের থেকে কমপক্ষে ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা পর্যন্ত সেবামূল্য আদায় করা হয়েছে, যেখানে সমপরিমাণ নগদ উত্তোলনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সেবামূল্য আদায় করেছে মাত্র ৬৩৯ কোটি টাকা। এই খরচ অনেক বেশি। এমনকি প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে এমএফএস সেবামূল্য সর্বোচ্চ। কিন্তু তারপরও সহজে সেবা পাওয়ার জন্যই ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত সাধারণ গ্রাহক এই খাতটিকে ব্যবহার করছে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিকে খরচ কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। সেই সঙ্গে গ্রাহকের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা ও আইনি কাঠামোর মাধ্যমে পুরো খাতকে ঢেলে সাজাতে হবে।
খবরের কাগজ: মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কি ধরনের অবৈধ লেনদেন হচ্ছে?
ইফতেখারুজ্জামান: এমএফএস ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। সেই সঙ্গে হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স, প্রতারণা, ঘুষের অর্থ লেনদেন, অনলাইন জুয়ার অর্থ লেনদেন ও পাচারের চিত্রও পাওয়া গেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাসমূহ বিভিন্ন সময়ে অনলাইন জুয়া ও বেটিং সংক্রান্ত ওয়েবসাইট, অ্যাপ, ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল বন্ধ করার উদ্যোগ নিলেও এমএফএসগুলো এই ধরনের লেনদেন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, শুধুমাত্র ২০২২ সালেই এমএফএস ব্যবহার করে প্রায় ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার বা ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে।
খবরের কাগজ: অবৈধ লেনদেন বন্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার
ইফতেখারুজ্জামান: ঘুষ, অর্থপাচার, অনলাইন জুয়া, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনে এমএফএস ব্যবহার করা হচ্ছে। যা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব সন্দেহজনক লেনদেন ও হুন্ডি কার্যক্রম শনাক্ত এবং প্রতিরোধে মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা নেই বললেই চলে। এ জন্য যারা মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত অর্থাৎ প্রতিটি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবধারীকে আয়করের আওতায় আনতে পারলে এখানে কোনো ধরনের সন্দেহজনক লেনদেন হচ্ছে কিনা তা আর্থিক দুর্নীতি প্রতিরোধে গঠিত সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) খতিয়ে দেখতে পারবে। এতে বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আয়, কর ফাঁকি এবং ঘুষ লেনদেনের বিষয়সমূহ চিহ্নিত করা যাবে।
খবরের কাগজ: রেমিট্যান্স বাড়াতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ভূমিকা সম্পর্কে বলুন
ইফতেখারুজ্জামান: বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রেমিট্যান্সে যে রেকর্ড তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ এমএফএস ব্যবহার করে অবৈধ হুন্ডি লেনদেন নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। যদিও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার কারণে নয়, এ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে এমএফএস ব্যবহার করে অর্থপাচারে জড়িত অপশক্তির পতনের ফলে। কাজেই এখন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যদি এই বিষয়ে সঠিক নীতি কাঠামো তৈরি করে দিতে না পারে, যেখানে এই ধরনের অপশক্তি কোনোভাবেই সক্রিয় হতে না পারে।