দেশের অর্ধেকের বেশি এলাকায় পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাসের সরবরাহ নেই। বিকল্প হিসেবে এলপিজি দিয়ে গৃহস্থালির চাহিদা মেটানো হচ্ছে। কিন্তু গত ১০ দিন থেকে হঠাৎ করে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ কমে গেছে। সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ১২ কেজির গ্যাস সরকার নির্ধারিত দামে ১৩০৬ টাকা তো দূরের কথা ১৭০০ থেকে ২০০০ টাকাতেও মেলে না। ভোক্তারা এ দোকান-সে দোকান কয়েকবার ঘুরে পাচ্ছেন না চাহিদামতো গ্যাস। এর কারণ জানতে খবরের কাগজ কথা বলেছে এলপি গ্যাস কোম্পানির সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)-এর সহসভাপতি ও এনার্জি-প্যাক পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদের সঙ্গে। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাহাঙ্গীর আলম।
খবরের কাগজ: বর্তমানে এলপি গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতি কেমন মনে করছেন?
মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ: দেশে এলপিজি খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এলপি গ্যাস আমদানি কোম্পানির সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। পৃথিবীর সব দেশ থেকে আমদানি করছে। তবে সম্প্রতি কয়েকটা জাহাজ আমেরিকার নিষেধাঙ্কায় পড়ায় একটু সংকট দেখা দিয়েছে। সরবরাহ কিছুটা কমে গেছে।
খবরের কাগজ: আপনাদের সংগঠন এমনকি সরকারও বলছে এলপি গ্যাসের মজুত সন্তোষজনক। তা হলে ডিলাররা গ্যাস পাচ্ছেন না কেন?
মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ: একেবারে সরবরাহ না থাকাটা অসন্তোষজনক। যেহেতু ৪০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ কমেছে অর্থাৎ ৬০ শতাংশ গ্যাসের সরবরাহ আছে। তাই এ অবস্থাকে সন্তোষজনক বলা যায়। যানজট শুরু হলে যেমন জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। ঠিক একইভাবে সরবরাহ কমার সুযোগ নিতে পারে দুষ্টচক্র। তাই দুষ্টচক্রের কবলে যাতে না পড়ে সরকারকে তা দেখতে হবে।
খবরের কাগজ: মোট কতগুলো কোম্পানি এলপিজির আমদানির সঙ্গে যুক্ত? বর্তমানে কতগুলো কোম্পানি আমদানি করছে।
মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ: ২৮টি কোম্পানি এলপি গ্যাস আমদানির জন্য সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়েছে। তবে বিভিন্ন কারণে কয়েকটির আমদানি বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে আমিসহ ৮ থেকে ৯টি কোম্পানি আমদানির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। বাকিরা না পারার কারণ হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমর্থন না পাওয়া। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা পেলে সরবরাহ সংকটও দ্রুত কেটে যাবে।
খবরের কাগজ: সরকার পরিবর্তনের দেড় বছর পর হঠাৎ করে এলপি গ্যাসের সংকট কেন?
মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ: সরকার পরিবর্তনের সময় হঠাৎ করে তো কেউ এলপি গ্যাস আমদানি বন্ধ করেনি। এটা আন্তর্জতিক সমস্যার প্রভাব বলা যায়। কারণ আমি আগেই বলেছি সম্প্রতি আমেরিকা সরকার বিশ্বের ৯ থেকে ১০টি জাহাজের মালিককে নিষেধাজ্ঞার আওতায় ফেলেছে। ফলে আমদানি নভেম্বরের তুলনায় গত ডিসেম্বরে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে।
খবরের কাগজ: গ্যাস কোম্পানি, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা কি মিলেমিশে হঠাৎ করে সিন্ডিকেট করছে। এ জন্য এই সংকট শুরু হয়েছে?
মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ: কোম্পানি পর্যায়ে সিন্ডিকেট করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ যারা লোয়াবের সদস্য তারা কোনো বেশি দাম নিতে পারে না। বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের গাইড লাইন ও বিইআরসির নির্ধারিত দামে ডিলারদের গ্যাস সরবরাহ করা হয়। ডিলাররা সিন্ডিকেট করলে সরকারকে কঠোরভাবে দমন করতে বলা হয়েছে। এমনকি খুচরা বিক্রেতারাও যাতে বেশি দামে বিক্রি করতে না পারে সে জন্যও সরকারকে বলা হয়েছে। কারণ তারা ভোক্তাদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করতে পারে। তারা এই কাজ করলেও বেশি দিন টিকবে না। কারণ অসৎভাবে ব্যবসা করলে বেশি দিন টেকা যায় না। কাজেই গ্যাস কোম্পানি, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা মিলেমিশে সিন্ডিকেট করে এই সংকট শুরু করেছে এটার কোনো ভিত্তি নেই।
খবরের কাগজ: রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এলপি গ্যাস নেই নেই অবস্থা। এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার উপায় কী? আপনারা কি পদক্ষেপ নিয়েছেন?
মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ: যে দিন থেকেই সরবরাহ কমে গেছে। আমরা বসে নেই। লোয়াব সরবরাহ বাড়ানোর জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। বেশি করে সরবরাহ বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি বিভাগ তাতে অনুমতি দেয়নি। সেটা করলে হয়তো এত সংকট হতো না। আমরা সংকট দূর করতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছি। কারণ এবারের মতো জীবনে কখনো সরবরাহ কমেনি। তাই আমরা তৎপরতা বাড়িয়েছি। আমি নিজেও কয়েকদিন আগে এলপি গ্যাস আমদানির জন্য এলসি খুলেছি। আশা করি ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। আমরা ভবিষ্যতের জন্য মজুত বেশি রাখব।
খবরের কাগজ: সংকটের মধ্যেও সরকার ১২ কেজি এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম ১৩০৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। এই পদ্ধতি কি ঠিক আছে?
মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ: সরকার বিইআরসিকে ক্ষমতা দিয়েছে। তারা সার্বিক দিক বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। কাজেই এই পদ্ধতি সঠিক আছে।
খবরের কাগজ: বিইআরসি প্রতি মাসে এলপি গ্যাসের দাম কিছুটা বাড়ায়, আবার সামান্য কমায়। এটা কি যৌক্তিক মনে করেন।
মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ: সরকারের কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাজ বণ্টন করে দেওয়া আছে। বিইআরসিকেও সিলিন্ডার গ্যাসের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা দিয়েছে সরকার। এটা যৌক্তিক পদ্ধতি।
খবরের কাগজ: প্রতি মাসে সরকার গ্যাসের দাম বাড়ায় বা কমায়। এ ব্যাপারে আপনাদের কি কোনো মতামত নেওয়া হয়?
মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ: সরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের কাজের মাধ্যমে সরকারকে সহায়তা করে। বিইআরসিও সরকারের নির্দেশিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতি মাসে গ্যাসের দাম বাড়ায় বা কমায়। এ ব্যাপারে আমাদের কোনো মতামত নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তারা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাম নির্ধারণ করে।
খবরের কাগজ: এলপি গ্যাসের দাম কীভাবে কমতে পারে। ভোক্তারা কম দামে পেতে পারেন।
মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ: সরকার ট্যাক্স কমালে বা তুলে দিলে ভোক্তারা কম দামে এলপি গ্যাস পাবেন। ভোক্তাদের স্বার্থেই এটা করা দরকার। কারণ দেশের অধিকাংশের বেশি মানুষ পাইপলাইনের মাধ্যমে কম দামে গ্যাস পান না। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ এমনকি অন্য অঞ্চলেও শহর ছাড়া লাইনের গ্যাস পান না। তাদের বেশি দামেই ১২ কেজির গ্যাস ১৩০০ টাকার বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। গরিব মানুষও এলপি গ্যাস ব্যবহার করছেন। আমরা কষ্টে আছি। ভারতে ট্যাক্স নেওয়া হয় না। তাহলে আমাদের কেন নেওয়া হবে। কাজেই বৈষম্য কমাতেই সরকারকে ট্যাক্স তুলে দেওয়া দরকার।