বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বর এখন মৌসুমি নয়, বরং নিয়মিত স্বাস্থ্যঝুঁকির নাম। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। হঠাৎ জ্বর, র্যাশ বা বমির মতো উপসর্গ দেখা দিলেই হতে পারে ডেঙ্গু। ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ, সতর্কতা ও প্রতিরোধ নিয়ে লিখেছেন সাজেদা আক্তার
ডেঙ্গু জ্বর একটি মারাত্মক রোগ, যা বর্তমানে দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি সাধারণত এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায় এবং শিশুদের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। গরমের দিনে বিশেষ করে বর্ষাকালে মশার উৎপত্তি বৃদ্ধি পায় এবং ফলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সম্ভাবনা বাড়ে। আপনি যদি একজন অভিভাবক হন, তবে আপনার শিশুর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ডেঙ্গু জ্বর কী?
ডেঙ্গু জ্বর একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা এডিস মশার মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। মশার কামড়ে ভাইরাস দেহে প্রবেশের পর তীব্র জ্বর হয়, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, গা ঘেমে যাওয়া এবং কখনো কখনো ত্বকে লালচেভাব দেখা দিতে পারে। শিশুদের মধ্যে এ ধরনের উপসর্গ দ্রুততর এবং অনেক সময় মারাত্মক হতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বরের সাধারণ উপসর্গ
শিশুর ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার প্রধান লক্ষণগুলো নিম্নলিখিত
উচ্চ জ্বর: প্রথমত শিশুর তীব্র জ্বর হতে পারে, যা সাধারণত ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি হতে পারে। এই জ্বর কোনো কিছু দিয়েই কমানো কঠিন।
শরীর ব্যথা: বিশেষত হাড় ও পেশিতে তীব্র ব্যথা অনুভব হয়। এরকম ব্যথা হলে শিশুদের মধ্যে কাঁপুনি ও অস্থিরতা তৈরির হয়।
মাথাব্যথা ও চোখে ব্যথা: ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত শিশু সাধারণত মাথার ওপর তীব্র ব্যথা অনুভব করে। যা চোখের পেছনেও ছড়িয়ে যেতে পারে। এতে চোখও লাল হয়ে যেতে পারে।
ত্বকে র্যাশ: ডেঙ্গু জ্বরের আরেকটি সাধারণ উপসর্গ হলো ত্বকে লালচে দাগ বা র্যাশের সৃষ্টি। এটি সাধারণত জ্বরের কয়েকদিন পর দেখা যায় এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।
অতিরিক্ত ঘাম ও ক্লান্তি: শিশুর অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে, বিশেষত রাতে। শারীরিক অস্থিরতা ও ক্লান্তি বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়।
মূত্রের পরিমাণ কমে যাওয়া: শিশুর মূত্রের পরিমাণ কমে গেলে তা গুরুতর লক্ষণ হতে পারে, যা শরীরে পানির ঘাটতির সংকেত দেয়।
ডেঙ্গু নির্ণয় ও চিকিৎসা পদ্ধতি
ডেঙ্গু শনাক্ত করার জন্য সাধারণত রক্ত পরীক্ষা করা হয়, যাতে ডেঙ্গু ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়। চিকিৎসক শিশুর বয়স, উপসর্গ এবং পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সঠিক চিকিৎসা নির্ধারণ করবেন। সাধারণত ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুর জন্য বিশুদ্ধ পানি, ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (এক ধরনের তরল যা পানিশূন্যতা দূর করে) এবং প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
কীভাবে প্রতিরোধ করবেন
ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য সচেতনতা ও প্রাথমিক সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার শিশুকে এই রোগ থেকে রক্ষা করতে কিছু সাধারণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবেন।
মশারি ব্যবহার করুন: মশা তাড়ানোর জন্য প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করুন এবং রাতে শিশুকে মশারি দিয়ে ঘুমানোর ব্যবস্থা করুন।
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা: বাড়ির আশপাশে পানি জমে থাকা স্থানে মশা বংশবৃদ্ধি করে। তাই বাড়ির সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে যেন আশপাশে কোথাও পানি জমে না থাকে।
শিশুকে হালকা কাপড় পরান: অতিরিক্ত গরম থেকে শিশুকে রক্ষা করতে হালকা কাপড় পরান, যা মশার কামড় থেকে রক্ষা করবে। এ ছাড়া মশা দমনের জন্য হালকা গন্ধযুক্ত মশার প্রতিরোধক মলমও ব্যবহার করা যেতে পারে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান: শিশু যদি স্কুল বা জনবহুল এলাকায় যায়, তবে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে ভুলবেন না। শারীরিক অস্বস্তি যেমন অস্বাভাবিক জ্বর বা ব্যথা দেখলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সুতরাং ডেঙ্গু একটি ভয়াবহ এবং অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, বিশেষত শিশুদের জন্য। তাই শিশুর প্রতি আপনার দায়িত্বের মধ্যেই অন্যতম কাজ হলো তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করা। যদি আপনার শিশুর মধ্যে ডেঙ্গুর কোনো উপসর্গ দেখা দেয়, তবে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করুন।