বাংলাদেশের মেধাবীরা বিভিন্ন দেশে উন্নত গবেষণা আর ভালো ফলাফল দিয়ে নিজেদের জাত চেনাচ্ছেন। প্রতি বছর বিদেশে পাড়ি জমানো শিক্ষার্থীদের এই হার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে ফিরছে কজন? সচরাচর বিভিন্ন দেশ তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে অন্য দেশের শীর্ষ মেধাবীদের নিয়ে যায়। এজন্য শতভাগ স্কলারশিপসহ নানান আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। আমাদের মেধাবীরা তীব্র প্রচেষ্টায় সেখানে দেশের মর্যাদাও উজ্জ্বল করেন। এসব মেধাবীর মধ্যে অনেকের আকাঙ্ক্ষা থাকে দেশের জন্য কিছু করার। কখনো তারা সুযোগ পান, আবার কখনো সুযোগের অপেক্ষায় দিন কাটান। এমনই একজন মেধাবী নিয়ে আজকের লেখা।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন এহসান উল্লাহ। ভালো ফলাফল থাকায় পরবর্তী সময়ে তিনি সেকেন্ড মেজর হিসেবে ২০১৯ সালে আবার গণিত বিভাগে ভর্তি হয়ে ডাবল স্নাতক ডিগ্রি গ্রহণ করেছিলেন। একই সঙ্গে দুই বিভাগে পড়াশোনা চালিয়েও পদার্থবিজ্ঞান থেকে সিজিপিএ ৩.৮৬ (with distinction) এবং গণিত বিভাগ থেকে সিজিপিএ ৩.৫৪ অর্জন করেন। এই মেধাবী তরুণ পরবর্তী সময়ে আকর্ষণীয় সুযোগ পেয়ে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে।
মেধাবী এই শিক্ষার্থী জানান, ‘আমি যখন শাবিপ্রবিতে ভর্তি হই, তখন ভালো ফলাফল থাকলে দুই বিষয়ে অনার্স করার সুযোগ দিত বিশ্ববিদ্যালয়। আমারও গণিতের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল। ফলে সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি। এই বিরল ডিগ্রি আমাকে পরবর্তী জীবনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।’
নিজের ভালো ফলাফলের জন্য পরিবারের সহযোগিতা পেয়েছেন এহসান উল্লাহ। বিশেষ মানুষদের প্রতি জানিয়েছেন কৃতজ্ঞতার কথা। এহসান উল্লাহ বলেন, ‘আমার স্নাতকে ভালো ফলাফলের জন্য সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা পেয়েছি আমার বোন ক্যাপ্টেন সুমাইয়া খাতুন (বাংলাদেশ আর্মি) থেকে। আমরা পিঠাপিঠি ভাইবোন হওয়ায় একই ক্লাস এ পড়তাম। এরপর আমার বাবা-মা এবং বড় চাচা প্রফেসর আব্দুল্লাহ আখতারের কাছ থেকে। পদার্থে আমি কাজ করতাম Organic Optoelectronics Lab এ প্রফেসর নাজিয়া চৌধুরী অধীনে। আমার রিসার্চ গ্রাউন্ড, অনার্সের থিসিস সবই তার তত্ত্বাবধানে হয়েছিল। আমার সুপারভাইজার ছিলেন প্রফেসর নাজিয়া চৌধুরী। পিএইচডি অ্যাপ্লিকেশনে তিনি Recomendation লেটার দিয়েছিলেন। বলতে গেলে এতদূর আসার পেছনে এই মানুষগুলো আমার অনুপ্রেরণা।
ডাবল অনার্স ডিগ্রি গ্রহণের নজির বাংলাদেশে বিরল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই স্মৃতির উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শাবিপ্রবির গণিত বিভাগে সেকেন্ড মেজরের সার্কুলার দিলে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর সাখাওয়াত হোসাইন আমাকে কোন কোর্স নিলে উচ্চশিক্ষায় কাজে লাগবে তা জানান। সেই যাত্রায় এতদূর পথচলা।’
তিনি আরও বলেন, ‘চাপ ছিল অনেক, ক্লাস ওভারল্যাপ করত। তবে প্রিয় শিক্ষক এবং ব্যাচমেটদের সহযোগিতায় সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে পারি। আমার পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষার সঙ্গে যেন গণিতের পরীক্ষা না মেলে, তার জন্য শিক্ষকরা আমার সঙ্গে পরামর্শ করে শিডিউল দিতেন।’
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়াতে পিএইচডি করছেন এহসান উল্লাহ। তার গবেষণার একটা পার্ট হলো Dynamics of tRNA Structure যেটা ভবিষ্যতে tRNA ভিত্তিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগ প্রতিরোধ, নিরাময় এবং ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োগ করা সব কার্যক্রম উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
দেশের মেধাবীরা বিদেশে পাড়ি জমাতে আগ্রহী। বিশেষ সুযোগ-সুবিধা, উপযুক্ত কাজের পরিবেশ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো বড় বিষয়গুলো এখানে কাজ করে। তবে এহসান উল্লাহ দেশের সেবায় ব্রত হতে চান। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই দেশে ফিরতে চাই যদি কাজ করার সুযোগ ও পরিবেশ পাই। রাজনীতি কিংবা দলাদলিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন হলে অবশ্যই শিক্ষা ক্ষেত্রে, গবেষণাভিত্তিক কাজ করতে চাই। আপাতত পিএইচডি শেষ করে পোস্টডক করার আগ্রহ রয়েছে।’
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাঙ্গন নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। মানসম্মত শিক্ষাঙ্গন কেমন হবে বলে মনে করেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন চাই। আমেরিকার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি নেই। কিন্তু আপনি দেখবেন, তাদের নেতৃত্বের কোনো কমতি নেই। অমুক নেতার সৈনিক, তমুক ভাইয়ের পরিচয়ে কেন পরিচিত হতে হবে? শিক্ষালয়ে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হোক ভালো ফলাফল।’
তার মতে, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের দেশে ফেরার অনাগ্রহের মূল কারণ তোষামোদী সংস্কৃতি। তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র এই তোষামোদী সংস্কৃতির কারণে হাজার হাজার মেধাবী ছেলেমেয়ে পিএইচডি শেষে দেশে ফিরতে চায় না। যারা শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি চায়, খোঁজ নিয়ে দেখবেন তাদের কতজনের ছেলেমেয়ে বাংলা মিডিয়ামে পড়ে আর দেশে থাকে।’
শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ ফেরাতে কথা বলেছেন এই মেধাবী তরুণ। জানান, ‘আমাদের দেশে সম্পদ সীমিত। তাই কী নেই, সেটা চিন্তা না করে কী আছে এবং কীভাবে কাজে লাগানো যায় তাই নিয়ে ভাবা উচিত। আমি আমার জীবনে অনেককে দেখেছি, ল্যাব নেই, ক্লাসে ভালো পড়ানো হচ্ছে না- এসব আফসোস করতে করতে নিজের মেধার স্পিরিট একটা সময় হারিয়ে ফেলেছেন।’
হাসান