চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসজুড়ে এখন উৎসবের রঙ। দেশের সবচেয়ে বড় সমাবর্তনে গাউন আর টুপি পরে উচ্ছ্বাসে ভাসছেন শিক্ষার্থীরা। কেউ বাবার হাত ধরে, কারও চোখে মায়ের অশ্রুজল-এই একটিমাত্র দিন যেন সমস্ত পরিশ্রমের গর্বকে আরও গভীর, আরও উজ্জ্বল করে তোলে।
এই উচ্ছ্বাসের ভিড়েও এক নীরব আলো ছড়িয়ে রয়েছেন তিন তরুণ-যারা আর নেই, তবু আজও ফিরে এসেছেন কালো রঙে আঁকা গাউন পরে, ক্যাম্পাসের এক দেয়ালে গ্রাফিতির ছবিতে। নিঃশব্দ সেই উপস্থিতি যেন স্মরণ করিয়ে দেয়, কিছু প্রাপ্তি শুধু হৃদয়ে লেখা থাকে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের পাশের দেয়ালে আঁকা হয়েছে তিন তরুণের স্মরণচিত্র। পরনে সমাবর্তনের কালো গাউন, মাথায় টুপি, হাতে সনদ-তারা যেন অদৃশ্য সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন বাকিদের সঙ্গে। মাঝখানে ইতিহাস বিভাগের শহিদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়া, পাশে একই বিভাগের ফরহাদ হোসাইন এবং পরিসংখ্যান বিভাগের ফাহিম আহমেদ পলাশ।
এই দেয়ালচিত্রটি দেখে অনেকেই থেমে যান মুহূর্তের জন্য। যেন মনে করিয়ে দেয়-সব অর্জন উদযাপনের সুযোগ মেলে না সবার। কেউ কেউ হারিয়ে যান সময়ের অতলে, কিন্তু রয়ে যান ইতিহাসের অমলিন রেখায়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান হৃদয় ও ফরহাদ। চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন তারা। আর একই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর বন্যায় আটকে পড়াদের সহায়তায় গিয়ে দুর্ঘটনায় মারা যান ফাহিম আহমেদ পলাশ।
বেঁচে থাকলে হয়তো তারাও আজ বন্ধুদের সঙ্গে গাউন পরে ছবি তুলতেন, মা-বাবার হাত ধরে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াতেন। কিন্তু সেই সুযোগ তাদের হয়নি।
সমাবর্তনে অংশ নেওয়া অনেক শিক্ষার্থীর নজর কেড়েছে এই দেয়াল চিত্র। ভিড় করছেন দেয়ালের সামনে ছবি তুলতে। কেউ দাঁড়িয়ে থাকেন নীরব শ্রদ্ধায়। একজন বললেন, ‘এই সমাবর্তনে ফাহিমও থাকতে পারত, হৃদয়-ফরহাদ আমাদের সঙ্গেই হাসত। তারা নেই, কিন্তু এই দেয়াল তাদের ফিরিয়ে এনেছে আমাদের কাছে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই তিন তরুণ এখন শুধুই নাম নয়, এক সময়ের প্রতিচ্ছবি-যেখানে শিক্ষা, দায়িত্ববোধ আর প্রতিবাদ একসঙ্গে মিশে গেছে। দেয়ালের গ্রাফিতি তাই কেবল শিল্প নয়, এটি এক স্মৃতিস্তম্ভ, সাহসের নিদর্শন।




