রাকসু নির্বাচনের ২১ দিন বাকি। এখনও সবাই প্রচারণা শুরু করেনি। অথচ প্রচারণা শুরুর আগেই নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের হিড়িক পড়েছে এবং কমিশনের নীরব ভূমিকা দেখা যাচ্ছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আকিল বিন তালেব। তিনি এজিএস প্রার্থী হচ্ছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। নিজের পরিচিতি আরও বাড়াতে আবাসিক হল, অ্যাকাডেমিক ভবনসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় ‘বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টার’ থেকে প্রাপ্ত নানান সুবিধা সম্বলিত ব্যানার সাটিয়েছেন। তার ব্যানারে কোথাও রাকসু নিয়ে কোনো কিছু লেখা না থাকলেও নির্বাচনের সামনে এমন ব্যানার সাটানোকে নির্বাচনি প্রচারণার অংশ হিসেবেই দেখছেন অনেকেই। এতে প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচনি আচরণবিধি মানা হচ্ছে কতটুকু।
রাকসুর আচরণবিধির ৪(ঙ) নম্বর ধারায় বলা আছে, ‘নির্বাচনি প্রচারণায় সাদা-কালো ৬০ সেমি ও ৪৫ সেমি পোস্টার ব্যবহার করা যাবে, ভবনের দেয়ালে লেখনী ও পোস্টার লাগানো যাবে না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক সমন্বয়ক আকিল বিন তালেব বলেন, ‘রাকসু নির্বাচনে অনেক প্রার্থী আছে যাদের ভোটার বা সাধারণ শিক্ষার্থীরা চেনে না। এখন আমাকে যদি একজন শিক্ষার্থী না চেনে তাহলে ভোট দিবে কেন? তাই রাকসুকে কেন্দ্র করে পরিচিতির জন্য এই সেবামূলক কাজের উদ্যোগ নিয়েছি। এই পোস্টারে আমার পদ বা রাকসুর বিষয়ে কোনো কিছু লেখা নেই। আর এটা নির্বাচনি আচরণবিধি প্রকাশের আগেই করেছি।’
শুধু আকিল বিন তালেব নয় তার মতো অনেকেই এমন আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন। মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের সময় দলবল নিয়ে উপস্থিত হওয়া, ব্যানার সাটানো, প্রচারণা শুরু হওয়ার আগেই হলের কক্ষে কক্ষে গিয়ে নিজের প্রার্থিতার জন্য দোয়া চাওয়া শুরু করেছেন কেউ কেউ। আবার কোনো কোনো পক্ষ থেকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের নেতা-কর্মীদের কক্ষে কক্ষে মুড়ি পার্টি, খাওয়া-দাওয়ার আয়োজনসহ বিভিন্ন আয়োজন চলছে। এতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব না হলে নির্বাচনের সামনের দিনগুলোতে এই পরিস্থিতি আরও তীব্র হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ছাত্র নেতারা।
হলে হলে উপঢৌকন বিতরণ
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ শিবিরের প্যানেল থেকে সহসভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচন করবেন। তিনি ছাত্রদের হলে-হলে আকর্ষণীয় প্যাকেটে মুড়িয়ে আতর বিতরণ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়াও শিবিরের নেতৃত্বে ছাত্র হলগুলোতে ‘ইনক্লুসিভ’ প্যানেল হচ্ছে। তাদের প্যানেলগুলো ইতোমধ্যে হলে হলে কাজ শুরু করেছে। শিক্ষার্থীদের মন জয় করতে নানা উপঢৌকন নিয়ে যাচ্ছেন তাদের প্যানেল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়-২৪ হলে শিবিরের প্যানেল থেকে নেতৃত্বে থাকবেন রাসেল ও মেশকাত। তারা গত দুদিন আগে হলের ডাইনিংয়ে কিছু প্লেট ক্রয় করে উপহার দেন। সেখানকার একটি ছবিও প্যানেলের ভিপি প্রার্থী রাসেল মিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে প্রচারণা চালান।
এ ছাড়াও শিবিরের প্যানেল থেকে বিভিন্ন হলের মসজিদে দেওয়া হচ্ছে বই ও বুক শেল্ফ। এর নাম দেওয়া হচ্ছে ‘মসজিদ ভিত্তিক বুক কর্ণার’। এভাবে হলে হলে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা শিক্ষার্থীদের মনোরঞ্জন করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করছেন অনেকে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের সঙ্গে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এক পর্যায়ে কল কেটে দেন।
এদিকে এমন উপঢৌকন দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে নির্বাচনি আচরণবিধিতে কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়নি।
দলবেঁধে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ
রাকসু নির্বাচনের আচরণবিধি ২(খ)-তে বলা হয়েছে, ‘মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিলের সময় কোনো ধরনের মিছিল বা শোভাযাত্রা করা যাবে না। কোনো প্রার্থী পাঁচজনের বেশি সমর্থক নিয়ে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দিতে পারবেন না।’ তবে মনোনয়ন সংগ্রহের দিনগুলোতে অধিকাংশ প্রার্থীকেই আচরণবিধি উপেক্ষা করে দল বেঁধে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে দেখা যায়।
এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। কিন্তু, এ ব্যাপারে ওই দিনগুলোতে নির্বাচন কমিশনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
যা বলছেন ছাত্রনেতা ও প্রার্থীরা
নির্বাচন কমিশন লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি করতে ব্যর্থ উল্লেখ করে শাখা ছাত্রঅধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী হাসান মারুফ বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি দেখছি একটা পক্ষ হলে আতর বিতরণ করছে, মুড়ি পার্টি করছে। বিশেষ করে আতর বিতরণ এটা সুস্পষ্ট আচরণবিধি লঙ্ঘন। এছাড়াও আচরণবিধিতে বলা হয়েছে কোনো ব্যানার, ফেস্টুন লাগানো যাবে না। কিন্তু এ সমস্ত কিছু হচ্ছে অথচ নির্বাচন কমিশন নির্বিকার ভূমিকায় রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আচরণবিধিটাও অসম্পূর্ণ। রাকসু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে এটি পরিপূর্ণ করা উচিত। আর প্রশাসনের চোখের সামনে আচরণবিধির বাইরে গিয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ঘটছে এতে আমরা শঙ্কিত যে তারা কতটা স্বচ্ছভাবে রাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারবে।’
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই দেখে আসছি নির্বাচন কমিশন লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। আমরা কয়েকবার প্রস্তাব দিয়েছি নির্বাচনি আচরণবিধিতে খরচের বিষয়টা সীমিত করতে। কিন্তু তারা গুরুত্ব দেয়নি। একজন সাধারণ শিক্ষার্থী যদি স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচন করে তাহলে তো সে রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে অর্থের হিসাবে পাল্লা দিতে পারবে না। এটা তো অযৌক্তিক। আমরা মনে করছি নির্বাচন কমিশন ইচ্ছাকৃতভাবে বিশেষ একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে খরচের বিষয়টা সীমিত করেনি।’
নির্বাচনের আচরণবিধি পূর্ণাঙ্গ নয় উল্লেখ করে স্বতন্ত্র ভিপি ও সিনেট পদপ্রার্থী নোমান ইমতিয়াজ বলেন, ‘নির্বাচনে একটি আচরণবিধি দেওয়া হয়েছে যা পূর্ণাঙ্গ নয়। এখানে আরও অনেক কিছুই যোগ করতে হবে। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচারণার খরচে টাকার সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাকসুতে এমন কোনো বিষয় উল্লেখ নেই। তা ছাড়া আচরণবিধিতে এখন যা আছে সেইটাও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রশাসন নীরব দর্শকের মতো সব শুধু দেখতেছে।’
সার্বিক বিষয়ে রাকসুর কোষাধ্যক্ষ এবং প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক সেতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা হলের প্রাধ্যক্ষদের সঙ্গে কথা বলেছি। যারা এই কাজগুলো করেছে তাদের খোঁজ নিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়াও ক্যাম্পাসে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার কারণে আমরা আমাদের মূল ট্র্যাকে থেকে কাজ করতে পারছি না। আমরা নির্বাচনি আচরণবিধি নিয়ে আলোচনা করব। খরচের বিষয়টা সীমিত করাসহ কয়েকটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করব।’
শাকিবুল/রিফাত/