বাংলার ইতিহাসে যার নাম উচ্চারিত হলেই বিদ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও মানবতার এক অনন্য সমন্বয় চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি শুধু একজন কবি নন, তিনি একটি চেতনার নাম, একটি দ্রোহী মানবিক দর্শনের প্রতীক। সেই দর্শনকে ধারণ করে গড়ে ওঠা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি এক জীবন্ত নজরুল ভুবন, যেখানে পা রাখলেই অনুভব করা যায় এখানে সর্বত্র নজরুল বিরাজ করে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে নজরুল কোনো পাঠ্যবইয়ের পাতায় আবদ্ধ চরিত্র নন। তিনি এখানে দৃশ্যমান, অনুভবযোগ্য এবং চলমান। সকালবেলার আলো, বিকেলের বাতাস, সন্ধ্যার নীরবতা সবখানেই যেন কবির উপস্থিতি। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জীবনচর্চা এখানে একে অন্যের সঙ্গে মিশে গিয়ে নজরুলকে করে তোলে প্রতিদিনের সঙ্গী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান প্রতীক নজরুল ভাস্কর্য। দৃপ্ত ভঙ্গি, দৃঢ় দৃষ্টি আর অবনতিহীন শিরে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভাস্কর্য শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয় অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার শিক্ষা। এর সঙ্গে সুর মিলিয়ে আছে ‘চির উন্নত মম শির’ ভাস্কর্য, যা নজরুলের আত্মমর্যাদা, সাহস ও আপসহীনতার শিল্পরূপ। এই ভাস্কর্য যেন নীরব ভাষায় উচ্চারণ করে কবির অমর পঙ্ক্তি মানুষের মর্যাদা কখনো আপসের বিষয় নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নান্দনিক সৌন্দর্যের এক অনন্য সংযোজন পদ্মপুকুরের মাঝখানে অবস্থিত ‘অঞ্জলি লহ মোর’ ভাস্কর্য। চারপাশে শান্ত জল, পদ্মপাতার সবুজ আর মাঝখানে থাকা এই ভাস্কর্য নজরুলের কোমল, প্রেমিক ও মানবিক সত্তাকে তুলে ধরে। বিদ্রোহী নজরুলের পাশাপাশি যে নজরুল প্রেম ও সৌন্দর্যের কবি, এই ভাস্কর্য সেই সত্যকে গভীরভাবে প্রকাশ করে। সন্ধ্যার আলোয় জলে ভাস্কর্যের প্রতিবিম্ব যেন কবির কবিতার মতোই হৃদয়ে নরম আলো জ্বেলে দেয়।
আবাসিক জীবনেও নজরুলচেতনা গভীরভাবে প্রোথিত।
ছাত্রীদের শিউলীমালা হল ও দোলনচাঁপা হল নামেই বহন করে কবির প্রকৃতিপ্রেম ও কাব্যিক কোমলতা। অন্যদিকে ছাত্রদের বিদ্রোহী হল ও অগ্নিবীণা হল নজরুলের অগ্নিগর্ভ সত্তা, প্রতিবাদ ও দ্রোহের প্রতীক। এই হলগুলোর আড্ডা, রাতজাগা আলোচনা, সাংস্কৃতিক চর্চায় নজরুল হয়ে ওঠেন নিত্যসঙ্গী; কখনো অনুপ্রেরণা, কখনো প্রশ্ন, কখনো প্রতিবাদের ভাষা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র জয়ধ্বনি মঞ্চ ও চুরুলিয়া মঞ্চ। এই দুই মঞ্চে নিয়মিত কবিতা আবৃত্তি, গণসংগীত, নাটক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে বারবার উচ্চারিত হয় নজরুলের ভাষা। কখনো ‘চল চল চল’, কখনো প্রেমের গান, কখনো সাম্যের আহ্বান- এই মঞ্চগুলোতে নজরুল কেবল স্মরণীয় নন, তিনি পুনর্জাগরিত।
তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুলময়তার সবচেয়ে গভীর ও আবেগঘন দিকটি হলো, ক্যাম্পাসসংলগ্ন স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই রয়েছে নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত বটগাছ। জনশ্রুতি ও ইতিহাস অনুযায়ী, এই বটগাছের তলায় বসেই কবি নজরুল ইসলাম বাঁশি বাজাতেন। আজও সেই বটগাছ যেন নীরবে বহন করে কবির সুর, নিঃসঙ্গতা আর সৃষ্টিশীল মুহূর্তগুলোর স্মৃতি।
বটগাছের ছায়ায় দাঁড়ালে মনে হয় এই মাটিতে এখনো লুকিয়ে আছে সেই বাঁশির হারানো সুর। এই বটগাছের পাশেই অবস্থিত বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়ি; নজরুলের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী। এখানে কবি কিছুদিন লজিং মাস্টার হিসেবে ছিলেন।
শিক্ষকতার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চা চালিয়ে গেছেন নিরলসভাবে। এই বাড়ি মনে করিয়ে দেয় নজরুলের সংগ্রামী জীবন। যেখানে কবি ছিলেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে যুক্ত, বাস্তব জীবনের অংশ।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় তাই কেবল উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এক আদর্শ নির্মাণের ক্ষেত্র। এখানে শিক্ষার্থীরা শেখে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হয়, আবার কীভাবে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ধরে রাখতে হয়। শেখে মাথা উঁচু করে বাঁচতে, কিন্তু হৃদয় নত রাখতে হয় মানবতার কাছে।
লেখক: জাককানইবি প্রতিনিধি




