রাবিতে ‘জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’ নামে একটি প্লাটফর্ম সিন্ডিকেট সভায় জুলাইযোদ্ধা হিসেবে তাদের নিয়োগের দাবি করেছে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে চাকরির জন্য অবস্থান নিয়েছে ‘জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’ নামে এই প্লাটফর্ম।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে শেষ সিন্ডিকেট সভা ঘিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) উত্তপ্ত পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে।
প্লাটফর্মটি এই সিন্ডিকেটে জুলাইযোদ্ধা হিসেবে তাদের নিয়োগের দাবি করছে। এ জন্য তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ‘জোরপূর্বক’ উপাচার্যের অফিস কক্ষে প্রবেশ করেন। অফিসের ভিতরে এক সাংবাদিক ভিডিও করায় তাকে ভিডিও ডিলেট করতেও চাপ দেওয়া হয়।
এদিকে এই প্ল্যাটফর্মটি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনকে ‘হুমকি’ দিয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসনের একটি সূত্র। তবে উপ-উপাচার্য সেটাকে হুমকি হিসেবে না নিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে আজ সন্ধ্যায় ৫৪৬তম সিন্ডিকেট সভা বসবে। এই সভা ঘিরে গত কয়েক দিন ধরেই বেশ আলোচনা হচ্ছে ক্যাম্পাসে। অনেকে মনে করছেন, নির্বাচনের আগে এটাই এই প্রশাসনের শেষ সিন্ডিকেট সভা। এরপর প্রশাসনের অনেকেই হয়তো পদত্যাগ করবেন। এ কারণে নির্বাচনের আগে এই সিন্ডিকেট সভাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেট সভায় রাজপথে থাকা জুলাইযোদ্ধাদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য চাপও তৈরি হয়েছে। তবে প্রশাসন এই বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে না।
প্রশাসনের সঙ্গে বসতে আজ সকাল থেকে ৬০ থেকে ৭০ জন ‘জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’ প্লাটফর্মের নেতা-কর্মীরা নিয়োগের দাবি জানিয়ে ক্যাম্পাসে অবস্থান নেন।
তারা প্রথমে বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করার জন্য আসেন। উপাচার্যের আরেকটি কাজ থাকায় সেসময় তারা দেখা করতে পারেননি। পরে আরও কয়েক দফা দেখা করতে যান তারা। তবে দুপুরের দিকে দেখা করার জন্য তারা সবাই উপাচার্যের অফিস কক্ষে ঢুকে পড়েন।
দুপুর সোয়া ১টার পর খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান উপাচার্যের অফিস কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি বলতে থাকেন, ‘কেন তারা একজন উপাচার্যের কক্ষে এভাবে প্রবেশ করেছেন। যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফাইল হারাতো। তাদের এখানে আসা উচিত হয়নি।’
এ সময় একজন সাংবাদিক বিষয়টির ভিডিও ধারণ করেন। এরপর সেখান থেকে প্রক্টর চলে গেলে ওই সাংবাদিককে উপাচার্যের কার্যালয়ে সবাই ঘিরে ধরে। তারা বার বার পরিচয় জানতে চায় এবং ধারণকৃত ভিডিও ডিলিট করার জন্য চাপ দেয়। একপর্যায়ে প্রক্টরকে ফোন করেন ওই সাংবাদিক।
ওই ফোনে জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান প্রক্টরের সঙ্গে কথা বলে ওই সাংবাদিককে দেয়। তবে তারা ছেড়ে দেওয়ার আগে ফোন নম্বর, কোন বিভাগে পড়েন এবং পরিচয়পত্র চেক করে।
এর পর প্লাটফর্মটির সদস্যরা সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মাঈন উদ্দীনের কার্যালয়ে যায়। তারা সেখানে গিয়ে তাকে হুমকি দিয়ে এসেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্বাচনের পর ‘জুলাইযোদ্ধাদের বলার জায়গা থাকবে না’
কর্মসূচিতে থাকা জুলাইযোদ্ধাদের দাবি, তারা রাজপথে বর্তমান প্রশাসনের অনেকের সঙ্গে আন্দোলন করেছেন। নির্বাচনের পর নতুন সরকার আসবে। তখন সেটা হয়ে যাবে জনগণের সরকার। তখন এভাবে জুলাইযোদ্ধাদের বলার জায়গা বা অধিকারের জায়গাটা থাকবে না। জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে গঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রশাসন বিপ্লবী প্রশাসন। তাই তারা চাকরির জন্য এখানে এসেছেন। কিন্তু প্রশাসন তাদের কথা শুনতে চাচ্ছে না।
জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে স্বৈরাচার পতনে যারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, তাদের মধ্য থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে কিছু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। প্রশাসন আগে এ বিষয়ে আশ্বাস দিলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পদে মজুরিভিত্তিক নিয়োগ হলেও আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা সেখান থেকে উপেক্ষিত হয়েছেন। তার ভাষ্য, বিভিন্ন জায়গায় নিয়োগ পাওয়া অনেকেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এবং কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকদের আত্মীয়স্বজনও নিয়োগ পেয়েছেন। এ ছাড়া মামলাভুক্ত কিছু শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানালেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে আজকে অন্তত পাঁচবার উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সাক্ষাতের সুযোগ না দেওয়ায় তারা উপাচার্যের কার্যালয়ে গিয়ে অবস্থান করছিলেন। তারা শেষ পর্যন্ত সাক্ষাতের জন্য রাত হলেও অবস্থান করবেন।’
সাংবাদিকের ভিডিও ডিলিট করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাংবাদিক হিসেবে তাকে চিনতে পারেনি অনেকে। এ কারণে তারা ভিডিওটা ডিলিট করতে বলেছিলেন। কারণ সেখানে নিউজ করার মত কিছু ঘটেনি।’
‘আমি থ্রেট ফিল করি না’
এদিকে নিজের দপ্তরে জুলাইযোদ্ধাদের হুমকি পেয়েও এটা থ্রেট হিসেবে দেখছেন না উপ-উপাচার্য মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন।
তিনি বলেন, ‘আজকের সিন্ডিকেট সভায় কোনো নিয়োগসংক্রান্ত এজেন্ডা নেই এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকশ মানুষের চাকরি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, এমন তথ্য আশপাশ এলাকায় গুজব আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে কিছু লোক নিয়োগ থেকে বাদ পড়ে যায় কি না তা নিশ্চিত হতে ক্যাম্পাসে এসেছিলেন তিনি।
হুমকি দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো ধরনের থ্রেট ফিল করি না। কেউ আমাকে থ্রেট দিলে সেটাকে আমি থ্রেট হিসেবে নিই না। আসলে এখানে থ্রেটের মতো কোনো বিষয়ই নেই।’
রাতে ক্যাম্পাসে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়ে কোনো আশঙ্কা আছে কি না? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবস্থান করলেও কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে না। কারণ আজকের সিন্ডিকেটে নিয়োগসংক্রান্ত কোনো আলোচ্যসূচিই নেই।’
তারা দাবি করছে তারা জুলাইযুদ্ধা। তাদেরকে মূল্যায়ন করা হয়নি, এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘কথা হলো আমরা প্রসেসটা শুরু করতে পারি নাই। আমরা এমপ্লয়ী রিক্রুটমেন্টের জন্য যে সব অফিশিয়াল কাগজপত্র রেডি করা সেগুলা তো এখনো হয়নি আরকি। আমি ওটাই বলছি যে আমরা সেটা করলে ফরমালি সেই রিক্রুটমেন্ট শুরু করব।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে জোর জবরদস্তি করে চাকরি আদায়ের চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থি। নিয়োগ হলে তা অবশ্যই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যোগ্যতার ভিত্তিতে হতে হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রশাসনিক কাজ ও শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত করে। কোনো দল বা গোষ্ঠীর নামে এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। হুমকি বা চাপের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া অত্যন্ত নিন্দনীয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার রয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে আইনিভাবে মোকাবিলা করা হবে।’
নিয়োগ বন্ধে ইউসিজির হস্তক্ষেপ চেয়ে বিএনপিপন্থিদের চিঠি
এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরিস্থিতিতে নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ বন্ধে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম, জিয়া পরিষদ ও ইউট্যাব। এই চিঠিতে এই তিন সংগঠনের সভাপতির স্বাক্ষর রয়েছে।
চিঠিতে তারা উল্লেখ করেছেন, তারা জানতে পেরেছেন যে আজ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সিন্ডিকেট সভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান প্রশাসন নিয়ম বহির্ভূতভাবে অ্যাডহক ভিত্তিতে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। গত জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল বৈষম্যবিরোধী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান কর্তৃপক্ষের নিয়োগের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়াও এই দ্রুততম সময়ে বিজ্ঞাপন ছাড়া এতো অধিকসংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও আলোচিত হচ্ছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের অভিভাবক হিসেবে এই নিয়ম বহির্ভূত অবৈধ নিয়োগ বন্ধে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল আলিম বলেন, ‘এই ধরনের নিয়োগ তৎপরতা এক থেকে দেড় মাস ধরে চলছে। নির্বাচনের আগে এ ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ রাখতে আমরা বার বার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে বলেছি। আজ ও গতকাল রাত থেকে এ নিয়ে ক্যাম্পাসে অবস্থান করছে একদল। এ কারণে আমরা আজ দুপুরে বিষয়টি ইউজিসি চেয়ারম্যানকে অবগত করেছি।’
শাকিবুল হাসান/সুমন/