ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে তরুণদের ভোটের গুরুত্ব বেশি। অনেক তরুণ এই নির্বাচনে প্রথমবার ভোট দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককানইবি) সহস্রাধিক শিক্ষার্থী বাড়ি গিয়ে ভোট দিতে পারেননি। তাদের মধ্যে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরাও আছেন।
যানবাহনের অতিরিক্ত ভাড়া, রাস্তায় যানজট, নিরাপত্তার শঙ্কা, একাডেমিক কার্যক্রম, ক্লাস ও পরীক্ষার চাপের কারণে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন না।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ছেলেদের দুটি ও মেয়েদের দুটি আবাসিক হলসহ মোট চারটি হলে বর্তমানে প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন মেসেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছেন। স্বল্প ছুটি ও যাতায়াত-সংকটের কারণে তারা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন না। তাছাড়া দিনাজপুর, পঞ্চগড়, সিলেট, বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালীর মতো দূরবর্তী জেলাগুলোতে স্বল্প সময়ে যাতায়াত করা বেশ কষ্টসাধ্য। ফলে সময় ও অর্থ উভয় দিক বিবেচনায় অনেকে বাড়ি যেতে পারেননি।
শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘এত গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচন যেখানে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে সে নির্বাচনে ভোট প্রদানের মাধ্যমে অংশ নিতে না পারাটা দুঃখজনক। ভোট দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বাস্তবতার কারণেই তারা যেতে পারেননি। বিশেষ করে যাতায়াত ব্যয়, ক্লাস ও পরীক্ষা বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই মনে করেন, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নির্বাচন উপলক্ষে যদি আলাদা পরিবহন ব্যবস্থা থাকত, তাহলে তারা বাড়ি গিয়ে ভোট দিতে পারতেন।’
নির্বাচনের পরপরই অনেক বিভাগের পরীক্ষা শুরু হবে। আবার অনেকের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার মধ্যেই পড়েছে নির্বাচন। এ কারণে টানা পাঁচ দিনের ছুটি পেলেও অনেকে বাড়ি যেতে পারেননি। এ জন্য তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একাডেমিক ক্যালেন্ডার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী ও খুলনা ডিভিশনাল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এলাহী মঞ্জুর ইমন বলেন, ‘সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার চাপের মধ্যে আমাদের থাকতে হচ্ছে। ৮ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষা ছিল, আবার ১৫ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষা আছে, আর ঠিক মাঝখানে আজ নির্বাচন। এই পরিস্থিতিতে দূরে গিয়ে ভোট দেওয়া আমাদের জন্য প্রায় অসম্ভব। আমরা সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চাই, কিন্তু পরীক্ষার কারণে সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত ছিল জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দিনটি বিবেচনায় রেখে পরীক্ষার রুটিন প্রণয়ন করা।’
বাড়ি ফিরতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে পড়তে হয়েছে বিড়ম্বনায়। অতিরিক্ত ভাড়া ও তীব্র যানজট মিলিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা ছিল বেশ কষ্টকর। অর্থনীতি বিভাগের ১৭তম আবর্তনের শিক্ষার্থী তানজিন তাবাসসুম অর্পিতা বলেন, ‘আমার বাড়ি নেত্রকোনায়। ময়মনসিংহ থেকে খুব বেশি দূরে নয়। কিন্তু গতকাল যানজটের কারণে স্বল্প দূরত্ব পাড়ি দিতেই লেগেছে প্রায় তিন ঘণ্টা। বাস ও সিএনজির ভাড়া স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। এত ভোগান্তি হবে জানলে হয়তো বাড়ি যেতাম না।’
ভোট দিতে না পারাদের তালিকায় জুলাই আন্দোলনের আন্দোলনকারীরাও রয়েছেন। জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ সারির নারী আন্দোলনকারী ও দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী মোছা. সানজিদা খাতুন বলেন, ‘রমজান মাসে আমাদের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা। হাতে খুব কম সময় আছে। ভোটের ছুটি মাত্র পাঁচ দিন হওয়ায় বাড়ি গেলে পড়াশোনার ক্ষতি হতো। তাই ক্যাম্পাসেই থেকে পড়াশোনা করছি।’
আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষার্থী শাহ বিলিয়া জুলফিকার বলেন, ‘রাস্তায় বাস, সিএনজি ও অন্যান্য যানবাহনের ভাড়া পাঁচ গুণ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এই ভোগান্তি সত্যিই কষ্টকর। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় দেখলাম বিভাগীয় শহরগুলোতে বাস দিয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও এমন উদ্যোগ নেওয়া যেত।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেরই এটি জীবনের প্রথম ভোট। জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল দূরবর্তী এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তত পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা করা।’
ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুম মিয়া এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় একদিন বেশি ছুটি দিয়েছে, এটি ভালো উদ্যোগ। তবে শিক্ষার্থীদের সংখ্যার ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকায় বাসের ব্যবস্থা করলে আরও ভালো হতো। আর্থিক সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে অনেকেই বাড়ি যেতে পারেনি।’
দর্শন বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী শাকিব আহমেদ হৃদয় জানান, ‘ভোট দিতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু টিউশন, পরীক্ষার চাপ ও অতিরিক্ত যাতায়াত খরচ আমাদের জন্য বড় সমস্যা। যদি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে অনেক শিক্ষার্থীই ভোট দিতে পারত।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা বা শিক্ষার্থীদের জন্য পোস্টাল ব্যালট চালু করা হলে তারা সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতেন।
রাফি/রিফাত/