চোখে দৃষ্টি নেই, কিন্তু হৃদয়ে আছে এক বিশাল নীল আকাশ। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসের কোলাহলে যখন সবাই পাঠ্যবইয়ের সাদা পাতায় চোখ বুলায়, তখন তিনি শব্দের গুঞ্জনে খুঁজে ফেরেন জ্ঞানের আলো। তিনি তৌফিক বিন জাহাঙ্গীর। টাইফয়েড যার শৈশবের সব রং কেড়ে নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দমাতে পারেনি হিমালয়সম ইচ্ছাশক্তিকে। নীলদিঘির শান্ত জল কিংবা ময়না দ্বীপের স্নিগ্ধ ছায়া— ক্যাম্পাসের এই চেনা সৌন্দর্যগুলো তিনি চোখে দেখেন না, কিন্তু অনুভব করেন তার তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে।
তৌফিকের গল্পটা শুরু হয়েছিল আজ থেকে বিশ বছর আগে। মাত্র দেড় বছর বয়স, তখনো পৃথিবীটা ঠিকমতো চিনে ওঠা হয়নি। সেই সময় এক কালান্তক টাইফয়েড হানা দেয় তার ছোট্ট শরীরে। ভুল চিকিৎসায় জ্বরের তীব্রতা যখন কমল, ততক্ষণে তৌফিকের চোখ থেকে পৃথিবীর সব রং মুছে গেছে চিরতরে।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ধুলোবালি মাখা মেঠো পথে তৌফিকের শৈশবটা ছিল এক অসম লড়াইয়ের গল্প। যেখানে চারপাশের মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে তার ভাগ্যে জুটেছে অবজ্ঞা আর বঞ্চনার কাঁটা। অন্ধকারের সঙ্গে মিতালি করা এই কিশোরের দিকে কেউ হাত বাড়িয়ে দেয়নি, বরং তার সীমাবদ্ধতাকে বানিয়েছিল বিদ্রূপের হাতিয়ার। কিন্তু তৌফিক সেই অবহেলার ক্যাকটাসেই ফুটিয়েছেন সাফল্যের গোলাপ; বুঝিয়ে দিয়েছেন আত্মবিশ্বাস থাকলে কণ্টকাকীর্ণ পথও ফুলের বিছানা হয়ে যায়।
ইংরেজি সাহিত্য— যেখানে জন মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’ কিংবা শেক্সপিয়ারের সনেটগুলো রঙিন হয়ে ধরা দেয় পাঠকদের চোখে। তৌফিক সেই দৃশ্যকল্পগুলো আঁকেন শব্দের তুলিতে। ব্রেইল পদ্ধতিতে উচ্চশিক্ষার বই নেই বললেই চলে, সরকারি সহায়তাও সীমিত। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র তৌফিক নন। ল্যাপটপ, মোবাইলের ‘স্ক্রিন রিডার’ সফটওয়্যারটি যখন যান্ত্রিক কণ্ঠে টেক্সটগুলো পড়ে শোনায়, তৌফিক তখন কল্পনার চোখে বিশাল এক জগৎ দেখতে পান। তৌফিক হাসিমুখে বলেন, ‘আমি কিবোর্ডে আঙুল চালালে কম্পিউটার কথা বলে ওঠে। যারা দেখে পড়তে পারে, তাদের চেয়ে আমার মনোযোগ হয়তো একটু বেশিই দিতে হয়। কিন্তু দিনশেষে জ্ঞান তো সবার জন্যই সমান।’
তৌফিকের মেধা কেবল ইংরেজি সাহিত্যের মোটা মোটা বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক আর সৃজনশীল অঙ্গনেও তিনি এক পরিচিত মুখ। দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা তাকে আটকে রাখতে পারেনি বিতর্কের মঞ্চ কিংবা আবৃত্তির আসর থেকে। তৌফিক যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ান, তখন তার কণ্ঠের দৃপ্ত উচ্চারণ আর যুক্তির ধার মুগ্ধ করে শ্রোতাদের। তৌফিক বলেন, ‘আমি কেবল পড়ার জন্য পড়ি না, আমি বাঁচতে চাই পূর্ণাঙ্গভাবে। তাই ডিবেট করি, কবিতা আবৃত্তি করি। এমনকি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের মতো কঠিন কাজেও আমি নিজেকে যুক্ত রেখেছি।’
ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা (হোস্টিং) করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার। দেখার চেয়েও তৌফিকের শোনার আর মনে রাখার ক্ষমতা প্রবল। আর এই তীক্ষ্ণ ধীশক্তিকেই তিনি কাজে লাগান মঞ্চের পারফরম্যান্সে। সহপাঠীরা অবাক হয়ে দেখেন, একজন মানুষ চোখের সাহায্য ছাড়াও কীভাবে নিখুঁতভাবে একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বা বিতর্কের মঞ্চে প্রতিপক্ষকে যুক্তিতে কুপোকাত করেন। তৌফিকের এই বহুমুখী প্রতিভা তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের চেয়ে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
লেখক: নোবিপ্রবি প্রতিনিধি




