ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করেছে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। নবনির্বাচিত এই সরকারের কাছে দেশের নারী শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা কী? বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের সেই প্রত্যাশাই তুলে ধরেছেন মো. তাসনিম হক রাফি
নিরাপদ, সমান ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ চাই
আরিফা ইসলাম আননি
শিক্ষার্থী, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
নতুন সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা নিরাপত্তা ও মর্যাদার নিশ্চয়তা। আমি এমন বাংলাদেশ চাই যেখানে একজন নারী দিন-রাত, গ্রাম-শহর সর্বত্র নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে।
কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সহিংসতা ও হয়রানির বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা প্রয়োজন। আইনের চোখে, সুযোগ-সুবিধায় ও কর্মক্ষেত্রে সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে ঘুষ বা প্রভাব ছাড়া। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন চাই- যেখানে সেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে না হয়। প্রশাসন জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবে।
নারীর নিরাপত্তা হোক প্রথম অগ্রাধিকার
ফাওজিয়া হোসেন আফিয়া
শিক্ষার্থী, ব্যবসায় প্রশাসন
বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি
নতুন বাংলাদেশ হোক নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন এবং মেধাভিত্তিক। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে চাকরির বাজারে দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাব নয়, বরং মেধা ও দক্ষতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। কারণ হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে অর্জিত ডিগ্রির অবমূল্যায়ন শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় ক্ষতি। বর্তমানে ডিজিটাল যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ছবি বিকৃতি বা ‘ডিপফেক’ হ্যারাসমেন্ট প্রতিরোধে সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে সর্বোচ্চ সতর্ক হতে হবে, যাতে কোনো মেধাবী বোনকে অপমানের ভয়ে পড়াশোনা ছাড়তে না হয়। যাতায়াতে নিরাপত্তা নিশ্চিতে গণপরিবহনে মনিটরিং এবং নারী নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
মুক্ত সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ চাই
সৈতি মণ্ডল
শিক্ষার্থী, সংগীত বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
আমি সংগীতের ছাত্রী। সংগীত একটি পরিবেশনা বিদ্যা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিভিন্ন সংগীতের আসর পণ্ড করা হয়েছে, মাজারে হামলা হয়েছে, বাউলদের ওপর হামলা হয়েছে। সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ রকম ঘটনার যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। আমরা একটি মুক্ত স্বাধীন পরিবেশ চাই, যেখানে মুক্তভাবে কোনো বাধা ছাড়া সংস্কৃতিচর্চা করতে পারব। শিল্পী ও সাংস্কৃতিককর্মীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে সংগীত, নাট্যকলা, চারুকলা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে যেন শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে, তাই কর্মক্ষেত্র বাড়াতে হবে।
কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ চাই
ফারজানা আক্তার ইলা
শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান বিভাগ পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কর্মজীবী নারীরা যেভাবে সাইবার বুলিং ও আক্রমণাত্মক এবং বাজে কথার সম্মুখীন হয়েছে, তা যেন না হয় নবনির্বাচিত সরকারের আমলে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছে, এ রকমটা করার যেন কেউ আর সাহস না পায়- নতুন সরকারকে সে বিষয়টা খেয়াল রাখতে হবে।
আমরা নারীরা আমাদের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাই। আর এই নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টিতে বর্তমান সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে।
শিল্প ধ্বংসের সাহস যেন কেউ না পায়
সাদিয়া আজাদ তুলতুল
শিক্ষার্থী, চারুকলা অনুষদ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
শিল্পকে বিলাসিতা নয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে দেখা হোক। শিল্পচর্চা একটি জাতির সংস্কৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। শিল্পশিক্ষায় বিনিয়োগ মানে দেশকে বিশ্বদরবারে নতুনভাবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি করা। দেশে আর্ট গ্যালারির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, কর্মশালা ও রেসিডেন্সির আয়োজন জরুরি। এতে তরুণ শিল্পীরা বিশ্বমানের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবে। শিল্পের উপকরণের উচ্চমূল্য শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বাধা; সরকারি ভর্তুকি বা সহায়ক তহবিল প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় উপকরণ সহজলভ্য হলে শিল্পচর্চা আরও সমৃদ্ধ হবে। শিল্প ও সংস্কৃতিকে অগ্রাধিকার দিলে সৃজনশীল ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।