রমজান আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের মাস। তবে এই ত্যাগের মহিমা ছাপিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এবারের ইফতার মাহফিল হয়ে উঠেছিল এক অনন্য মিলনমেলা। সাধারণত রাজনীতির মাঠ কিংবা প্রশাসনিক টেবিলে সচরাচর আমরা যে বিভেদ বা দূরত্ব দেখি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফারেন্স রুমের ইফতারের দৃশ্যটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত ‘সম্প্রীতির ইফতার’ যেন নজরুলের সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনারই এক মূর্ত প্রতীক হয়ে ধরা দিল।
ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এই ইফতারে যোগ দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ শীর্ষ পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কিন্তু আয়োজনের বিশেষত্ব ছিল ভিন্ন জায়গায়। ইফতারের দস্তরখানে পাশাপাশি বসেছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নেতা-কর্মীরা। ক্যাম্পাস রাজনীতিতে যাদের মধ্যে আদর্শিক লড়াই বা মতভেদ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, সেই রাজনৈতিক দলের নেতারা এদিন একে অপরের সঙ্গে করমর্দন ও কোলাকুলি করে রমজানের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। প্রতিহিংসা আর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ভুলে তাদের এই ভ্রাতৃত্বপূর্ণ অবস্থান উপস্থিত সবাইকে এক আশার বার্তা দিয়েছে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন
ইফতার মূলত মুসলিমদের ধর্মীয় রীতি হলেও নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আয়োজনে দেখা গেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চমৎকার উদাহরণ। এই ইফতারে সানন্দে অংশ নিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও। ধর্মের দেয়াল টপকে মানুষ যে দিনশেষে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে, সেই দৃশ্যই যেন ফুটে উঠেছিল প্রতিটি টেবিলে। অসাম্প্রদায়িক কবি নজরুলের আদর্শে গড়ে ওঠা এই বিদ্যাপীঠে এটি ছিল এক শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মেলবন্ধন
সাধারণত একাডেমিক পরিসরে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে আনুষ্ঠানিক দূরত্ব থাকে, ইফতারের আসরে তা বিলীন হয়ে যায়। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পাশে বসে খাবার ভাগ করে নিচ্ছেন, হাসি-মুখে কুশলাদি বিনিময় করছেন, এমন দৃশ্য ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরাও একই সারিতে বসে ইফতার করেছেন কর্মকর্তাদের সঙ্গে, যা সামাজিক সমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মূল সুর: ঐক্য ও উন্নয়ন
ইফতারের আগে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বক্তারা উল্লেখ করেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হলো এর সম্মিলিত অংশগ্রহণ। রাজনীতির ময়দানে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর স্বার্থে এবং মানবিক সম্পর্কের খাতিরে সবাইকে এক হওয়া জরুরি। প্রেসক্লাবের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে অনেকে বলেন, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক ও বৈষম্যহীন ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তুলতে এমন ‘সম্প্রীতির সংস্কৃতি’ নিয়মিত চর্চা করা উচিত।
শেষ কথা
সূর্যাস্তের আজানের সাথে সাথে যখন গ্লাসে গ্লাসে শরবতে চুমুক দেওয়ার শব্দ আর খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙার মুহূর্ত এলো, তখন কনফারেন্স রুম জুড়ে ছিল এক প্রশান্তিময় নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতা যেন বলছিল- মতভেদ থাকবে, আদর্শ ভিন্ন হবে, কিন্তু মানুষ হিসেবে আমরা সবাই এক। নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের এই আয়োজন কেবল একটি ইফতার মাহফিল ছিল না, বরং এটি ছিল হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত এক আগামীর স্বপ্ন।
জাতীয় কবির সাম্যের গানের সুর ধরেই যেন ত্রিশালের এই প্রাঙ্গণ থেকে ছড়িয়ে পড়ল সম্প্রীতির অমিয় বাণী: ‘মোরা একটি বৃন্তে দুটি ফুল, হিন্দু-মুসলমান।’
তাসনিম হক/নাঈম