ময়মনসিংহ নগরীতে বিল্ডিং কোড না মেনেই বহুতল ভবন নির্মাণের প্রবণতা বেড়েছে। ভবন নির্মাণের সময় কাগজে-কলমে ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা’ মেনে চলার কথা লিপিবদ্ধ থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয় না। কাজের সময় নকশা বদলে ফেলারও অভিযোগ রয়েছে। চারদিকে যে পরিমাণ জায়গা ছেড়ে ভবন নির্মাণের কথা তাও মানা হয় না। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এসব বহুতল ভবন বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নগরীর ৭২ হাজার ৬২১টি হোল্ডিংয়ে ভবন রয়েছে লক্ষাধিক। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন হওয়ার পর দেড় হাজারের বেশি ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নগরীতে গত পাঁচ বছরে দুই শতাধিক সাততলার চেয়ে উঁচু ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিল্ডিং কোড না মানায় ৬০টি ভবনের মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে সিটি কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয়রা জানান, নগরজুড়ে বহুতল ভবন নির্মাণের মহোৎসব চলছে। বেশির ভাগ নির্মিত ও নির্মাণাধীন ভবনে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মানা হয়নি। কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পরই জানা যায় ওই ভবনটি নিয়ম মেনে করা হয়নি। নকশাবহির্ভূতভাবে নির্মাণ চলা ভবনগুলোর কাজ এখনই থামিয়ে দেওয়ার দাবি করেছেন তারা।
নগরীর জেল রোডের সাইফুল ফিলিং স্টেশনের মালিক সাইফুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের পাম্প ঘেঁষে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। আমার অফিসঘেঁষে ট্যাংকি নির্মাণ করা হয়েছে। চারপাশে যতটুকু জায়গা ছেড়ে নির্মাণ করা উচিত, তাও মানা হয়নি। সিগারেটের আগুনও যদি পাম্পে পড়ে সে ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সিটি করপোরেশনে অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার পাওয়া যায়নি।’ তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘সম্প্রতি ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। সিটি করপোরেশনের অসাধু কর্মকর্তারা ইচ্ছে করেই কোনো পদক্ষেপ নেননি। তাই বাধ্য হয়ে আদালতে মামলা করেছি।’
জামান নামে নগরীর কাচিঝুলি এলাকার আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘শহরের অলিগলিতে দেদার চলছে বহুতল ভবন নির্মাণ। অনেকেই ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বা বিল্ডিং কোড মানছেন না। এভাবেই অপরিকল্পিত নগরায়ন বাড়ছে। সব দেখেও অজানা কারণে কর্তৃপক্ষ চুপ করে বসে আছে।’
বিল্ডিং কোড না মানার কারণে ভবিষ্যতে স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্পেও মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে উল্লেখ করে ময়মনসিংহ রেইন বিল্ডার্সের পরিচালক প্রকৌশলী নাদিম পারভেজ খান বলেন, ‘শহরের অনেক এলাকায় দেখেছি সিটি করপোরেশনের অনুমতি ছাড়াই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। কোনো প্রকৌশলীর পরামর্শ পর্যন্ত না নিয়ে তিনতলা ফাউন্ডেশন দেওয়া হয়েছে। বেশির ভাগ সময় একতলা পর্যন্ত নির্মাণ করে বাড়ির মালিক ঝুঁকির বিষয়টি বুঝতে পেরে প্রকৌশলীর পরামর্শ নেন। এতে বাড়ির মালিক নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ ছাড়া নগরীতে বহুতল ভবন নির্মাণে অনেকে যথাযথভাবে বিল্ডিং কোড না মানায় নগরবাসী ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। ভূমিকম্পে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আগেই সিটি কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক মতিউর রহমান বলেন, নগরে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগে হলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। তাই এখন থেকেই সবার সচেতন হওয়া দরকার।’
এদিকে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ভবন নির্মাণের বিষয়টি খোদ সিটি করপোরেশনই স্বীকার করে নিয়েছে। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের (মসিক) নগর পরিকল্পনাবিদ মানস কুমার বিশ্বাস বলেন, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু তার পরও অনেকেই নিয়ম মানছেন না। যেসব ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত লেআউট প্ল্যানের ব্যত্যয় ঘটেছে, সেগুলো আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী ভেঙে দিয়েছি। আমাদের বিশেষজ্ঞরা নির্মাণাধীন ভবনগুলো পরিদর্শন করছেন।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সুমনা আল মজীদ বলেন, ‘বাড়ির মালিকদের নিজেদের স্বার্থেই বিল্ডিং কোড মানা প্রয়োজন। আমরা চাই না, নগরবাসী ঝুঁকির মধ্যে পড়ুক। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা না মেনে ভবন নির্মাণ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’