৮০ বছর বয়সী জয়নাল আবেদীনের বাড়ি ঢাকার ধামরাইয়ে। কুল্লা ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ফোর্ডনগর এলাকায় এই বাসিন্দা যাতায়াতের জন্য বাড়ির পাশের ধলেশ্বরী নদীতে বানানো বাঁশের সাঁকোটি ব্যবহার করেন। এই সাঁকো নিয়ে তার আক্ষেপ রয়েছে।
জীবনের ৫১ বছর তিনি এই জায়গাটি নৌকায় পারাপার হয়েছেন। দুবছর আগে বানানো বাঁশের সাঁকোটি দিয়ে এখন চলাচল করেন। কিন্তু তিনি চান এখানে একটি পাকা সেতু বানানো হোক। প্রয়োজনে নিজের বয়স্ক ভাতা বন্ধ করে হলেও এখানে একটি সেতু বানানোর দাবি করেন তিনি।
বয়সের কারণে ভালোভাবে কথা বলতে না পারা জয়নাল আবেদীন আধো আধো ভাষায় বলেন, ‘আমি সরকারের কাছ থেকে বয়স্ক ভাতা পাই। ওই ভাতা বন্ধ করে হলেও আমাদের এই ধলেশ্বরী নদীর ওপর একটি পাকা সেতু করে দেওয়া হোক। আমাদের অনেক কষ্ট হয়। প্রত্যাশা একটাই, শেষ জীবনে যেন এখানে একটি সেতু দেখে যেতে পারি।’
গত সোমবার (২৩ ডিসেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, কুল্লা ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ফোর্ডনগর এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর ওপর ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের বাঁশের সাঁকোটি বানানো হয়েছে। নড়বড়ে এই সাঁকোর ওপর দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মালামাল নেওয়ার পাশাপাশি মোটরসাইকেল নিয়ে সাঁকো পার হন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয়দের দুর্ভোগ কমাতে কুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান ও স্থানীয় ইউপি সদস্য উজ্জ্বল মিয়া নিজস্ব অর্থায়নে দুবছর আগে ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের এ সেতুটি নির্মাণ করেন। এরপর থেকে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, গার্মেন্টকর্মীসহ হাজারও মানুষ প্রতিদিন এ ব্রিজের ওপর দিয়ে যাতায়াত করতে থাকেন। বাদ যায় না মোটরসাইকেল ও অটোরিকশাও। কিন্তু দিনদিন সাঁকোটি নড়বড়ে হতে থাকে। এতে বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এই বাঁশের সাঁকো দিয়ে ফোর্ডনগর, ফকির পাড়া, খাসিরচর, বহুতকোল, জয়মন্টপ, ধল্লা, গাজিংগা, আড়ালিয়া, ফরিঙ্গা, খরারচর, মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলাসহ প্রায় ২০/২৫ গ্রামের মানুষ যাতায়াত করেন। সাঁকোটি পার হতে প্রতিটি মোটরসাইকেল আরোহীকে ১০ টাকা করে দিতে হয়। ওই অর্থ রাখা হয় সেতুর সংস্কার কাজে। কিন্তু বেশিরভাগ মোটরসাইকেল চালক টাকা না দিয়ে চলে যান। ব্যক্তিপর্যায়ে কোনো রকমে যাতায়াত করা গেলেও নির্মাণসামগ্রীর মতো ভারী পণ্য ওই সাঁকোর ওপর দিয়ে নেওয়া যায় না। তখন অন্তত ১৫ কিলোমিটার ঘুরে যাতায়াত করতে হয়।
বাঁশের সাঁকো মেরামত করতে আসা শ্রমিক ওমর আলী বলেন, ‘প্রতি মাসেই সাঁকো মেরামত করতে হয়। হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, সাইকেল নিয়ে সাঁকোর ওপর দিয়ে যাতায়াত করেন। এতে সাঁকো নড়বড়ে হয়ে যায়। তাই মেরামত করা লাগে। নইলে যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। তখন পথচারীদেরও ভোগান্তি পোহাতে হবে।’ কুল্লা ইউনিয়নের কুলসুম বেগম তার প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে সপ্তাহে দুই দিন ডাক্তারের কাছে যান। প্রথমে ছেলের হুইল চেয়ার পার করেন। পরে আবার অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে আসেন। একটি পাকা সেতু হলে তার মতো হাজারও মানুষকে আর কষ্ট করতে হবে না বলে জানান ভুক্তভোগী ওই নারী।
ওই এলাকার বাসিন্দা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাতুল আহমেদ বলেন, ‘আগে নৌকা দিয়ে পার হতে হতো। এখন বাঁশের সাঁকো রয়েছে। তবে ভোগান্তি কিন্তু এখনো যায়নি। অনেক কষ্ট করে পারাপার হতে হয়। দূরদূরান্তের লোকজন, অসুস্থ রোগী কিংবা ছোট বাচ্চাদের জন্য বাঁশের সাঁকোটি খুবই বিপজ্জনক। এখানে একটি পাকা সেতু হলে মানুষকে আর ভোগান্তি পোহাতে হতো না। ১০ টাকা করে চাঁদা নিয়ে সাঁকো মেরামতের জন্য চিন্তা করতে হতো না।’
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী গোলাম রাব্বি বলে, ‘সকাল-বিকেল এই সাঁকোর ওপর দিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করি। কোচিংয়ে যাই। বাঁশের সাঁকো পার হওয়ার কারণে বাড়ির সবাই চিন্তায় থাকেন। একসঙ্গে অনেক মানুষ উঠলে মনে হয় এই বুঝি ভেঙে পড়বে।’
কুল্লা ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য উজ্জ্বল মিয়া বলেন, ‘ধামরাই উপজেলার দক্ষিণ প্রান্তের সবচেয়ে অবহেলিত গ্রাম ফোর্ডনগর। এখানে কবে ব্রিজ হবে এ প্রশ্নটি স্থানীয়দের সবার। সাঁকোর কারণে সকালে সবজিবাহী গাড়িগুলো ১৫/২০ কিলোমিটার ঘুরে যাতায়াত করতে হয়।’
ধামরাই এলজিইডির প্রকৌশলী মিনারুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ১৫০ মিটার ব্রিজের একটি প্রকল্প রয়েছে। ওই প্রকল্পে ফোর্ডনগর ব্রিজের নাম রয়েছে। প্রকল্প পাশ হলে আমরা ব্রিজ বানিয়ে দেব।’