২০৪ জন গাছি তাদের উৎপাদিত ঝোলা গুড়, দানা গুড়, পাটালি, বাদাম পাটালি ও তিলে পাটালি নিয়ে স্টলে স্টলে আছেন ক্রেতার অপেক্ষায়। ক্রেতারাও তাদের পছন্দমতো গুড়-পাটালি কিনছেন। এ ছাড়া স্কাউটস সদস্যরা রস জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করছেন।
পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তারা গুড় দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পিঠার স্টল দিয়েছেন। বলছিলাম, খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য ধরে রক্ষায় যশোরের চৌগাছা উপজেলায় তৃতীয় খেজুর গুড়ের মেলার কথা। গতকাল বুধবার যশোরের জেলা প্রশাসক আজাহারুল ইসলাম মেলার উদ্বোধন করেন। উপজেলা পরিষদ চত্বরে বৈশাখী মঞ্চে অনুষ্ঠিত গুড় মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুস্মিতা সাহা। উপজেলা প্রশাসন আশা করছে, মেলা থেকে তিন দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ মণ গুড়-পাটালি বিক্রি করতে পারবেন গাছিরা।
‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’, ‘স্বাদে সেরা গন্ধে ভরা, খেজুর গুড়ে মনোহরা’- এ ঐতিহ্য ধারণ করে চৌগাছা উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় গাছিদের নিয়ে গতকাল বুধবার থেকে আগামীকাল শুক্রবার পর্যন্ত উপজেলা চত্বরে ৩ দিনব্যাপী এই গুড়ের মেলা অনুষ্ঠিত হবে।
এর আগে ২০২৩ সালের ১৬ ও ১৭ জানুয়ারি উপজেলায় দেশের প্রথমবারের মতো খেজুর গুড়ের মেলা আয়োজন করে চৌগাছা উপজেলা প্রশাসন। প্রতি বছরের মতো এবারের মেলায়ও খেজুর গুড় নিয়ে বিশেষ গম্ভীরার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এবারের মেলার দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার রয়েছে গ্রামীণ ঐতিহ্য লাঠিখেলার বিশেষ আয়োজন।
মেলায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, রস জ্বালানোর পাত্র তাপাল থেকে খেজুর গাছের পাতা দিয়ে গরম গরম গুড় খাওয়া। এ গুড় খেতে গিয়ে আগত দর্শনার্থীরা নস্টালজিয়ায় ডুবে যান। গুড় খেতে খেতে মাসুদ রহমান বলেন, ‘সেই শৈশবে ও কৈশোরের দিনগুলোতে জালই (মাটির তৈরি পাত্র) আর তাপাল (টিনের তৈরি পাত্র) থেকে খেজুর পাতা দিয়ে গরম গরম গুড় খেয়েছি। আর এখন চৌগাছার গুড়মেলায় এসে গরম গুড়ের স্বাদ নিতে পারছি।’
মেলায় ৯৩ কেজি গুড় নিয়ে আসেন হাকিমপুর ইউনিয়নের স্বরূপপুর গ্রামের গাছি আব্দুল কুদ্দুস। আব্দুল কুদ্দুসের রয়েছে ৫০৩টি খেজুর গাছ। তিনি বলেন, ‘৩টি মেলাতেই আমি অংশ নিয়েছি। মেলার ৩ দিনে অন্তত ৬ মণ (২৪০ কেজি) গুড় বিক্রির আশা করছি।’
মেলায় গত বছরের শ্রেষ্ঠ গাছি পুরস্কার পাওয়া আব্দুল গাজী বলেন, ‘এবারও আমি শ্রেষ্ঠ গাছি হব।’ মেলায় আসা উদ্যোক্তা আতাউর রহমান বলেন, ‘আমাদের চৌগাছা, তথা যশোরের গুড় সারা দেশের পাশাপাশি বহির্বিশ্বেও চাহিদা আছে। এ জন্য আমাদের এখানকার গুড়ের দামও বেশি।গুড়ের মেলা শুরু হওয়ার পর এই চাহিদা আরও বেড়েছে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসাব্বির হুসাইন বলেন, ‘উপজেলায় রস উৎপাদনের মতো খেজুর গাছ রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার। এটা থেকে উপজেলার প্রায় ১৪০০ গাছি রস উৎপাদন করেন। দেশের অন্যান্য এলাকার থেকে চৌগাছার খেজুর গুড়ের স্বাদ বেশি হওয়ায় এর চাহিদা বেশি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুস্মিতা সাহা বলেন, ‘মেলার তিন দিনে গাছিরা ৫০০ থেকে ৬০০ মণ গুড় বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছি। উপজেলা প্রশাসন সব সময়ই গাছিদের পাশে ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে।’
জেলা প্রশাসক আজাহারুল ইসলাম বলেন, ‘খেজুর গাছ প্রস্তুত থেকে শুরু করে রস সংগ্রহ ও গুড় পাটালি তৈরির কাজে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা গেলে কাজটি আরও সহজ হবে। গাছ প্রস্তুত থেকে গুড় তৈরি পর্যন্ত যে ধাপগুলো রয়েছে, তা যশোরের ঐতিহ্যবাহী প্রসিদ্ধ একটি শিল্প। যশোরের জিআই পণ্যের এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে খেজুরগাছ রক্ষার বিকল্প নেই।’