দরজায় কড়া নাড়ছে পাহাড়ের অন্যতম প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসাবি। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই আর চাকমাদের বিজু- এই তিন সম্প্রদায়ের উৎসবের আদ্যক্ষর নিয়ে বৈসাবির নামকরণ। এই উৎসবে পাহাড়ি নারীদের পরিধেয় ঐতিহ্যবাহী পোশাক কোমর তাঁতে বোনা হয়। যেকোনো উৎসব আয়োজনে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা এই পোশাক পরে থাকেন।
চাকমাদের কাছে এটি পিনন-হাদি আর ত্রিপুরাদের কাছে রিনাই-রিসা নামে পরিচিত। সারা বছর অন্য ধরনের পোশাক পরলেও বৈসাবি উপলক্ষে পাহাড়ি নারীদের পছন্দের তালিকায় প্রথমেই থাকে এই বস্ত্র। এক সময় হাতেগোনা কয়েক রঙের সুতা দিয়ে পিনন-হাদি তৈরি হতো। তবে বর্তমানে বিভিন্ন রঙের সুতা ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেকে নিজেদের মনের মতো নকশা করছেন।
পিনন-হাদি ও রিনাই রিসা বুনন-সংশ্লিষ্ট পাহাড়ি নারীরা জানান, ঐতিহ্যবাহী এসব পোশাক মানভেদে ৪ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। সবচেয়ে চড়া দামে বিক্রি হয় বিয়ের পিনন-হাদি এবং রিনাই রিসা।
কদিন বাদেই বিজু, বৈসু, সাংগ্রাই, বিষু ও বিহু উৎসব। পাহাড়ের প্রধান এ উৎসবকে ঘিরে শেষ মুহূর্তে তাঁতশিল্পীদের ব্যস্ততা বেড়েছে। কোমর তাঁতে দিন-রাত কাজ করে উৎসবের আগেই পোশাকটি প্রিয়জন কিংবা ক্রেতার হাতে তুলে দিতে চান তারা। অনেকে এই সময়ে কাপড় বুনে বাড়তি অর্থ আয় করছেন।
বৈসাবি এলেই পাড়ায় পাড়ায় কোমর তাঁতের ছন্দময় শব্দ শোনা যায়। কোমর তাঁতে নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য পোশাক তৈরির রীতি চলছে যুগ যুগ ধরে। আবার এর পাশাপাশি কেউ কেউ বিক্রির জন্যও পিনন-হাদি-রিনাই বুনছেন।
গত সোমবার দুপুরে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার চম্পাঘাট এলাকায় এক তাঁতে দুটি রিনাই বুনছিলেন বিশাখা ত্রিপুরা (৩৬)। নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী নকশা দিয়ে দুই সপ্তাহ ধরে তিনি এক তাঁতে দুটি রিনাই বুনছেন। তার এক প্রতিবেশী বৈসাবি উপলক্ষে আগেভাগেই রিনাইয়ের আগাম অর্ডার করে রেখেছেন। বিশাখা বলেন, ‘এখন উৎসবের আগেই দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে। এ জন্য রাত-দিন কাজ করছি। উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে ১০ এপ্রিল থেকে।’
পানছড়ির ভাইবোনছড়া এলাকার সম্প্রীতি চাকমা (৩৪) বলেন, ‘সারা বছর কষ্ট করে কোমর তাঁতে পিনন-হাদি তৈরি করি। তখন অনেক সময় ন্যায্য দামও পাই না। বছরের এই সময়ে প্রচুর চাহিদা থাকে। অনেকে আগে থেকে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী নকশা দিয়ে যান। তাই কিছু লাভের আশায় রাত-দিন খেটে তৈরি করছি।’
অনেকে আবার বাড়তি আয়ের আশায় এই সময় কোমর তাঁতে কাপড় বোনেন। তাদেরই একজন খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী অনুজা চাকমা। তিনি বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি থেকে পিনন-হাদি বুনছি। এ বছর আমার কাছে তিন সেট পিনন-হাদির অর্ডার পড়ছে। রমজানের সময় কলেজ বন্ধ থাকায় অর্ডারের চেয়েও বেশি বুনেছি। সবগুলো চড়া দামে বিক্রিও হয়ে গেছে। ওই টাকা দিয়ে এ বছর নিজের পছন্দমতো পোশাক কিনতে পেরেছি। কিছু টাকা মাকেও দিতে পেরেছি।’