সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ও সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা খরস্রোতা সোনাই নদীতে (বাইরং নদী) মাটি ও পাথরের বাঁধ দিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছে একটি চক্র। তাই খরস্রোতা এই নদীতে বাঁধ দেওয়ার ফলে বিরূপ প্রভাব পড়ছে নদীতীরবর্তী জনপদে।
এই বাঁধের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে বন্যার পানি সরাসরি আঘাত করে তীরবর্তী এলাকায়। যার ফলে ২০২২ এর ভয়াবহ বন্যা ও ২০২৩ এর আকস্মিক বন্যায় কোম্পানীগঞ্জ ও ছাতকের অসংখ্য বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট ভেঙেছে। কয়েক হাজার হেক্টর ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে।
নদীতে বাঁধ দেওয়া এই চাঁদাবাজ চক্রে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতের নেতা-কর্মীরা রয়েছেন। তাই মানুষজনের এত দুর্ভোগ জেনে এবারও নদীর উপর বাঁধ দিয়ে চাঁদাবাজি চলমান রাখা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছাতক ও কোম্পানীগঞ্জের সীমান্তঘেঁষা সোনাই নদী স্থানীয়ভাবে বাইরং নদী নামে পরিচিত। এই নদীতে মাটি ও পাথরের বাঁধ দিয়েছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র। এই বাঁধের উপর দিয়ে ছাতকের ইছামতী নদী থেকে পাথরভর্তি ট্রাক ও ট্রাক্টর যায় কোম্পানীগঞ্জে। সোনাই নদীর ছনবাড়ী-গাংপাড় নোয়াকোট পয়েন্টের এসব ট্রাক ও ট্রাক্টর থেকে চাঁদাবাজি করছে ওই চক্রটি।

প্রতিবার একেকটি ট্রাক থেকে তোলা হয় ৩০০ টাকা। আর বাঁধে ট্রাক্টর রেখে নৌকা থেকে লোড করা হয় বালু। প্রতি ট্রিপ বালুর জন্য ট্রাক্টর থেকে তোলা হচ্ছে তিন হাজার টাকা।
এই বাঁধের কারণে প্রতিবছর নদী ভাঙনের কবলে পড়েন রতনপুর, নিজগাঁও, গাংপাড় নোয়াকোট, বাহাদুরপুর, বৈশাকান্দি, বনগাঁও, ছনবাড়ী ও তৎপার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকজন।
সরেজমিন দেখা গেছে, নদীর ছনবাড়ী-গাংপাড় নোয়াকোট অংশে ৩৫০ ফুট দীর্ঘ ও প্রায় ১৮ ফুট প্রস্থ করে মাটি ও পাথরের বাঁধ দেওয়া হয়েছে। মাঝে পানি চলাচলের জন্য ১০ ফুট অংশ নিচু করে রাখা হয়েছে। বাঁধটি টেকসই করার জন্য তার দুইপাশে ভাঁজে ভাঁজে বিপুল পরিমাণ পাথর ফেলা হয়েছে। বাঁধ নির্মাণের ব্যয় তোলার কথা বলে বাঁধের পশ্চিম পাশে গাংপাড় নোয়াকোট মসজিদের ঘাটে বসে ট্রাক ও ট্রাক্টর থেকে আদায় করা হচ্ছে চাঁদা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মুহিবুর রহমান মানিকের সহচর ও ছাতকের ইসলামপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মখলিছুর রহমান, তার বড় ভাই বিএনপি নেতা আব্দুল কুদ্দুস, ছোট ভাই রফিক আহমদ ও জামায়াত নেতা পরিচয়ধারী ব্যবসায়ী ইলিয়াছুর রহমানসহ কতিপয় দুর্বৃত্ত মিলে এই বাঁধ নির্মাণ করেছেন। তারা সবাই একই পরিবারের সদস্য এবং সবাই খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, চোরাচালানসহ বহু মামলার আসামি। দুর্গম এলাকা হওয়ায় গণ-অভ্যুত্থানের পরও তাদের লুটপাট ও চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে।

জানা যায়, নদীতে এই চক্রের দেওয়া বাঁধের ওপর দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ৪০০ ট্রাক ও ট্রাক্টর বালু-পাথর পরিবহন করে। ফলে এখান থেকে প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ টাকার বেশি চাঁদাবাজি হয়।
এলাকাবাসী জানান, সেখানকার আলোচিত বুলবুল হত্যাকাণ্ডের পরও গ্রেপ্তার না হওয়ায় মখলিস চক্রের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না।
ছাতক গাংপাড় এলাকার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট সাইফুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘নদীর উপর বাঁধ দেওয়া বেআইনি। এই বেআইনি কাজ করে তারা আবার চাঁদাবাজি করছে। মাটির বাঁধটির অদূরেই একটি নতুন ব্রিজ নির্মাণাধীন। এই ব্রিজটির কাজ তারাই আটকে রেখেছে। কারণ ব্রিজটি হলে এই চক্র চাঁদাবাজি টিকিয়ে রাখতে পারবে না।’
ছাতক ইসলামপুর এলাকার বাসিন্দা কামরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই মাটির বাঁধ নির্মাণের ফলে ২০২৩ সালে বন্যায় বনগাঁও, শাহ আরেফিন, বাগানবাড়ি, রতনপুর, ধনীটিলা ও পুরান নোয়াকোট রাস্তা ভেঙেছে। তারা গুটিকয়েক মানুষ এই বাঁধ করে আর্থিক লাভবান হচ্ছেন। কিন্তু এর ফলে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি সবার হচ্ছে। এই বাঁধ নির্মাণে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতের নেতারা জড়িত। তাই ৫ আগস্টের পর সারাদেশ স্বৈরাচারমুক্ত হলেও আমাদের এলাকা বেআইনি , চাঁদাবাজির মতো কাজ এখনো আওয়ামী লীগের নেতারা করে যাচ্ছেন।’

এ বিষয়ে অভিযুক্ত মখলিছুর রহমান জানান, ‘এতদিন এখানে ব্রিজ না থাকায় এলসির পাথর পরিবহনের সুবিধার কথা ভেবেই তারা মাটি ও পাথর ফেলে বাঁধটি নির্মাণ করেছিলেন। কয়েক বছর আগে যখন এই বাঁধ তৈরি হয়, তখন এখানে কোনো ব্রিজ ছিল না। বর্তমানে একটি ব্রিজ হলেও গাড়ি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়নি।’
এলসি ব্যবসায়ী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ-প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সম্মতি নিয়েই বাঁধটি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
চাঁদাবাজি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো চাঁদাবাজি হয় না। বরং গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বাঁধের মেরামতের প্রয়োজনে টাকা তোলা হয়।’
তবে নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি চলাচল বন্ধ রাখায় কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে পারেননি।
এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আজিজুন্নাহার খবরের কাগজকে বলেন, ‘নদীতে বাঁধ দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা ছিল না। শুক্রবার রাতে আমি এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হই। নদীতে বাঁধ দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ। ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে আমি বিষয়টি অবগত করেছি। তারা স্পটে আছেন। তারা নদীর সীমানা নির্ধারণ করে দেবে। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে এই বাঁধ অপসরণের ব্যবস্থা করছি।’
অমিয়/