‘পরিবার নেই, তবে স্বপ্ন আছে’- এই বিশ্বাসেই এগিয়ে চলেছে পঞ্চগড়ের আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীর ১২ কিশোর। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় সবাই পাস করেছে। প্রমাণ করেছে- ভালোবাসা, যত্ন আর সহানুভূতি থাকলে কোনো শিশুই পিছিয়ে পড়ে না।
ছিন্নমূল, অবহেলিত বা হারিয়ে যাওয়া জীবন থেকে উঠে আসা এই শিশুদের শৈশব ছিল কষ্টের ক্যানভাসে আঁকা। কেউ রেলস্টেশনে হারিয়েছে পরিবার, কেউ আবার ছোটবেলায়ই জেনেছে- তার কোনো ঘর নেই। বিচ্ছিন্ন জীবনের গল্পগুলো একত্র হয়ে তৈরি করেছে বন্ধুত্ব। গড়ে তুলেছে স্বপ্ন।
এই ১২ কিশোর হলো কবির হোসেন হৃদয়, সাব্বির হোসেন, সফিকুল ইসলাম, পারভেজ রানা, আবদুল মজিদ, সুজন আলী, রাকিবুল হাসান, বরজুল রহমান বায়েজিদ, তাপস চন্দ্র রায়, জিহাদ মিয়া, আল আমিন ও হৃদয় কুমার। তারা প্রত্যেকেই পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।
সবচেয়ে ভালো ফল করেছে কবির হোসেন হৃদয়। তার জিপিএ-৪ দশমিক ৯৬। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি ছেড়েছিল। আশ্রয় নিয়েছিল রেলস্টেশনে। সেখান থেকে ২০১৪ সালে আসে শিশু নগরীতে। নারায়ণগঞ্জ শহরে তার বাড়ি, বাবার নাম রিয়াজ, মায়ের নাম রোকেয়া। তার একটাই স্বপ্ন- একদিন ফিরে যাবে মা-বাবার কাছে।
আবদুল মজিদ পেয়েছে ৪ দশমিক ৮২। লালমনিরহাট থেকে হারিয়ে যায়, তবে পরে পরিবার খুঁজে পেলেও থেকে গেছে শিশু নগরীতেই। এখন এটাকেই মনে করে নিজের বড় ঠিকানা। সাব্বির হোসেন পেয়েছে ৪ দশমিক ৭৫। জানে না তার শিকড় কোথায়। শুধু মনে আছে বাবার নাম মারুফ, মায়ের নাম ছবি আক্তার।
এই কিশোরদের আশ্রয় আহছানিয়া মিশন শিশু নগরী। পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের জলাপাড়া গ্রামে অবস্থিত এ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১২ সালে। এখানে ১৬০ জন অনাথ, পথশিশু ও বঞ্চিত শিশু নতুন জীবনের আশায় আশ্রয় পেয়েছে।
শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে এখানকার শিশুরা ভর্তি হয় স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। এবার যারা এসএসসি পাস করেছে, তারাও এখান থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা পেয়েছে।’
শিশু নগরীর সেন্টার ম্যানেজার দীপক কুমার রায় বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করি শিশুদের অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরিয়ে আনতে। তারা যেন ভালো মানুষ হয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে, সেটাই লক্ষ্য।’