রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে এসি বন্ধ থাকা এবং চরম অবহেলার কারণে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর তিনি বলেন, ‘আমার আইনে যতটুকু কঠোর হওয়া সম্ভব, আমরা ততটুকুই যাব। এবার আর কাউকে মাফ করে দেওয়া যায় না।’
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ঘটনার পরপরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টায় তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি এবং দায়িত্বরত নার্স ও স্টাফদের চরম অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনে অপরাধ ও অবহেলা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। হাসপাতালটির যে পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে এই ঘটনা ঘটেছে, সেটি আমরা ইতোমধ্যে সিলগালা করে দিয়েছি। তবে পুরো হাসপাতালে দুই শতাধিক রোগী ভর্তি থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালটি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। আগামী দুই দিনের মধ্যে বিষয়টি আইনগতভাবে পর্যালোচনা করা হবে এবং রোববারের মধ্যে হাসপাতালটির বিষয়ে চূড়ান্ত ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, ইনশাআল্লাহ।’
হাসপাতালগুলোর লাগামহীন অব্যবস্থাপনা রোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা সচিব, মহাপরিচালক (ডিজি) এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে যেভাবে আকস্মিক পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করছি এবং যে ধরনের কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি, তাতে ভবিষ্যতে কোনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এভাবে বদ্ধ ঘরে রোগী বা শিশু রাখার দুঃসাহস দেখাবে না বলে আমার বিশ্বাস।’
তিনি আরও জানান, বেসরকারি হাসপাতালের নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে এখন থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি ও ভবন পরিদর্শন বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
ছয় নবজাতকের মৃত্যুকে কেবল পেশাগত অবহেলা নাকি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ এবং এ ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে। আবেগের কারণে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনরা শিশুদের মরদেহ নিয়ে গেছেন, যা আসামিপক্ষ আইনি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। তবে এটি রাতের আঁধারে সংঘটিত কোনো গোপন ঘটনা নয়; এটি শতভাগ প্রমাণিত সত্য। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বিজ্ঞ আদালত আসামিদের কোনো ছাড় দেবেন না।’
তদন্ত কমিটির বরাত দিয়ে মন্ত্রী বলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ২ নম্বর পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষটি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য মোটেও উপযোগী ছিল না। ৯০০ বর্গফুট আয়তনের ওই কক্ষে ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি মানুষ অবস্থান করছিলেন। দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা না থাকায় কক্ষটিতে অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা নবজাতকদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সবশেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনদের নিয়ে আমরা ধারাবাহিকভাবে ভার্চুয়াল সভা (জুম মিটিং) করছি। আমাদের নির্দেশনা ও তদারকি দিন দিন আরও কঠোর হবে, যার বাস্তব প্রতিফলন আপনারা খুব শিগগিরই মাঠপর্যায়ে দেখতে পাবেন।’
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অমিয়/