সিলেটে দ্বিতীয় দিনের মতো সাদা পাথরের লুটপাট করা পাথর উদ্ধার করতে অভিযান চালাচ্ছে প্রশাসন। গতকাল শুক্রবার এই অভিযানের সময় মাটি ও বালুচাপা দিয়ে আড়াল করা লুটের পাথর কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। দুই দিনে দেড় লাখ ঘনফুট পাথর উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। তবে বেশ কিছু এলাকার ক্র্যাশার মিলে এখনো অনেক লুট করা পাথর মাটি ও বালুচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। এদিকে পাথর উত্তোলনের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত।
সিলেট জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গতকাল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আশিক কবিরের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী এই অভিযানে নামে। অভিযানের শুরুতে বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে বিভিন্ন ক্র্যাশার মিলের পেছনে ও গর্তে মাটি ও বালুচাপা দেওয়া পাথর উদ্ধার করা হয়। কোম্পানীগঞ্জ ও সিলেটের বিভিন্ন স্থান থেকে গত দুই দিনে দেড় লাখ ঘনফুট পাথর উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া র্যাব ঢাকার কাঁচপুর ও ডেমরা থেকে গত বৃহস্পতিবার রাতে ৭০ হাজার ঘনফুট পাথর জব্দ করেছে। এসব পাথর পর্যায়ক্রমে সাদা পাথরে প্রতিস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসনসংশ্লিষ্টরা।
এদিকে অভিযানের সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ক্র্যাশার মিলের মালিক অভিযোগ করেন, যারা পাথর লুট করেছে তারা ক্র্যাশার মিল ও ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে চলে গেছে। এখন ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েছেন।
অভিযান চলাকালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আশিক কবির সাংবাদিকদের জানান, কোম্পানীগঞ্জের শতাধিক স্থানে লুটের পাথর মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে, এমন তথ্য তাদের কাছে আছে। এ ছাড়া লুটের পাথর শুধু ক্র্যাশার মিলেই নয়, কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে, এমনকি রান্নাঘরের পেছনেও লুকানোর চেষ্টা করছে লুটেরা চক্র। উদ্ধার হওয়া এসব পাথর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সাদা পাথর এলাকায় প্রতিস্থাপনের কাজ গত বুধবার রাত থেকে শুরু হয়। এখনো তা চলমান আছে।
ভোল পাল্টাল সিলেটের বিএনপি-জামায়াত
সিলেট বিভাগের বন্ধ পাথরমহাল খুলে দেওয়ার দাবিতে মাস দু-এক আগে ১৪ জুন মানববন্ধনে অংশ নিয়ে ব্যবসায়ী মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সঙ্গে একাত্ম হয়েছিল সিলেট বিএনপি ও জামায়াত। তবে এবার সাদা পাথর লুটপাটের পর এ দুটি দল ভোল পাল্টেছে। বলছে অন্য কথা।
বৃহস্পতিবার রাতে পৃথক বিবৃতিতে এই লুটপাটের ঘটনায় নিন্দা, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকার ও প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন বিএনপি-জামায়াতের স্থানীয় নেতারা।
বিএনপির বিবৃতিতে এই আহবান জানিয়েছেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী এবং মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী। জামায়াতের বিবৃতিতে একই আহ্বান জানিয়েছেন মহানগরীর আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান, মহানগর নায়েবে আমির ড. নূরুল ইসলাম বাবুল, জেলা নায়েবে আমির অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নান ও হাফিজ আনওয়ার হোসাইন খান, মহানগর সেক্রেটারি মো. শাহজাহান আলী এবং জেলা সেক্রেটারি মো. জয়নাল আবেদীন।
বিবৃতিদানকারী দুই রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে ২৪ জুন ব্যবসায়ী মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, জামায়াতের সিলেট মহানগরের আমির মো. ফখরুল ইসলাম ও জেলা সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন।
সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতারা বৃহস্পতিবার বিবৃতিতে সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর, জাফলং, বিছনাকান্দিসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক পরিবেশকে ধ্বংস এবং পাথর ও বালু উত্তোলনের ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রশাসন, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও বর্তমানে দায়িত্বে থাকা সেনাবাহিনীকে আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে নেতারা বলেন, ‘দলমত নির্বিশেষে এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ড, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ সুরক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছেন এবং ভবিষ্যতেও এই নীতি অব্যাহত থাকবে।’
অন্যদিকে, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ পর্যটন কেন্দ্রের সাদা পাথর এলাকা থেকে পাথর লুটপাটের ঘটনাকে জামায়াত নেতারা তীব্র নিন্দা জানিয়ে লুটপাটে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি বৈধভাবে পাথর কোয়ারি সরকারি ব্যবস্থাপনায় খোলার আহ্বান জানান।
এভাবে আগের অবস্থান থেকে সরে আসার বিষয়ে দুই দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে ও বিদেশে নজিরবিহীন প্রতিবাদ দেখে জনরোষ মোকাবিলায় তারা এই বিবৃতি দিয়েছে এবং আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে।