ভোগ্যপণ্যের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ। বছরখানেক আগেও এখানে চিনির বাজার ছিল অস্থির। তিন মাস আগেও এই বাজারে প্রতি কেজি চিনি ১০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হয়। বর্তমানে আমদানি বাড়ায় দীর্ঘ পাঁচ বছর পর পাইকারিতেই প্রতি কেজি চিনির দাম ১০০ টাকার নিচে নেমেছে। তবে খুচরা বাজারে এর সুফল ক্রেতারা পাচ্ছেন না।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাঁচ বছর আগে খাতুনগঞ্জে ৯৫ টাকায় চিনি বিক্রি হয়েছিল। এরপর সব সময় ঊর্ধ্বমুখী ছিল পণ্যটির বাজার। গত বছরও এই সময়ে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হয়েছিল ১৩০ টাকায়। বর্তমানে কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৯৫ টাকায়। চিনির দাম কমার পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। আগে কিছু বড় শিল্পগ্রুপ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও ভারত থেকে কাঁচা চিনি আমদানি ও পরিশোধনের মাধ্যমে বাজারজাত করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতো। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চিত্র পাল্টে গেছে।
তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রতি টন পরিশোধিত চিনির আমদানি শুল্ক ৬ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৪ হাজার টাকা করা হয়েছে। যেকোনো ব্যবসায়ীর সরাসরি পরিশোধিত চিনি আমদানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। তার ওপর বিশ্বব্যাপী চিনির উৎপাদন বৃদ্ধি ও বুকিং রেট কমেছে। সবমিলিয়ে আমদানি ও সরবরাহ বাড়ায় বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। তাই পণ্যটির দামও কমতে শুরু করেছে।
পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের আগস্ট মাসে পাইকারিতে প্রতি কেজি চিনি ১৩০ টাকায় বিক্রি হয়। ওই বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাইকারিতে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হয়েছিল ১১৪ থেকে ১১৮ টাকায়। চলতি বছরের এপ্রিলে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হয়েছিল ১০৮ টাকায়। এক মাস পর দাম আরও কমে মে মাসে বিক্রি হয়েছে ১০৩ টাকায়। তিন মাস পর আগস্টে এসে বড় দরপতন হয় চিনিতে। বর্তমানে পাইকারিতেই প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৯৫ টাকায়।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের আইনবিষয়ক সম্পাদক ও চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেছেন, ‘গত বছর এই সময়ে খাতুনগঞ্জে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হয়েছে ১৩০ টাকায়। এখন বিক্রি হচ্ছে ৯৫ টাকায়। সে হিসাবে, চিনির দাম অনেক কমে গেছে। এর মূল কারণ হলো- আগে গুটিকয়েক বড় ব্যবসায়ীর দখলে ছিল চিনির বাজার। এখন আমদানি উন্মুক্ত হওয়ায় বড়দের পাশাপাশি ছোট ব্যবসায়ীরাও চিনি আমদানি করতে পারছেন। সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার কারণে পণ্যটির দাম কমে গেছে।’
চিনির আমদানিও আগের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য মতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯৮০ টন পরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৩৮০ টন পরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছে।
সম্প্রতি বেসরকারিভাবে ৫ লাখ টন চিনি আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ লাখ টন চিনি আমদানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পণ্যের আন্তর্জাতিক মান ও বিএসটিআই নির্ধারিত মান কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
এদিকে পাইকারি বাজারে চিনির দাম কমে এলেও খুচরা বাজারে সেভাবে দাম কমেনি। পাইকারিতে ৯৫ টাকায় বিক্রি হওয়া চিনি খুচরায় মিলছে ১১০ টাকায়। সে হিসাবে পাইকারি ও খুচরায় ব্যবধান ১৫ টাকা।
নগরের চকবাজার এলাকার বাসিন্দা মো. আলমগীর বলেন, ‘খুচরা বাজারে ১১০ টাকায় চিনি বিক্রি হচ্ছে। এটা অনেক বেশি। ১০৫ টাকায় বিক্রি হওয়া উচিত। অন্যথায় পাইকারি বাজারে দাম কমার সুফল মিলবে না।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রতি কেজি চিনিতে ১৫ টাকা লাভ হলে, খুচরা ব্যবসায়ী বস্তাপ্রতি অনেক টাকা মুনাফা করছে। এটা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। চিনির দাম এখন পাইকারিতে বেড়ে গেলে রাত পোহানোর আগেই খুচরা দাম বেড়ে যাবে। কিন্তু পাইকারিতে যখন দাম কমে যায়, তখন খুচরায় আর কমে না। বাজারে যথাযথ অভিযান পরিচালনা হচ্ছে না বলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’