টাঙ্গাইলে একসময় নদী-নালা, খাল-বিলে শাপলা ফুলের সমারোহ ছিল। বর্ষা থেকে শরতের শেষ পর্যন্ত জলাভূমি ভরে যেত শাপলা ও ঢ্যাপের ফলনে। বর্তমানে অতিরিক্ত পুকুর খনন, কৃষিজমিতে স্থাপনা, কীটনাশক ব্যবহার ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এগুলো দ্রুত হারাচ্ছে। শাপলা ও ঢ্যাপ শুধু সৌন্দর্যের নয়, গ্রামীণ জীবনে খাদ্য ও ওষুধ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। টাঙ্গাইল কৃষি বিভাগের মতে, রক্ষার পদক্ষেপ নিলে এখনো পুনরুদ্ধার সম্ভব। না হলে আগামী প্রজন্ম কেবল বইয়ে ছবি দেখবে।
শাপলা শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, গ্রামীণ জীবনে ছিল এক বড় খাদ্য ও ওষুধের উৎসও। শাপলার ডাঁটা দিয়ে রান্না করা তরকারি এক সময় ছিল গ্রামীণ মানুষের নিয়মিত খাদ্য। আর ‘ঢ্যাপ’ খাওয়ারও ছিল বহুমুখী ব্যবহার। গ্রামে প্রচলিত বিশ্বাস, এটি আমাশয়, বদহজম ও রক্ত আমাশয়ের ওষুধ হিসেবে কার্যকর। এক সময় টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে ‘ঢ্যাপ’ সহজেই বিক্রি হতে দেখা যেত। এখন তা দুর্লভ হয়ে উঠেছে।
ঢ্যাপের ভেতরে থাকে অসংখ্য ছোট ছোট বীজদানা। সেগুলো রোদে শুকিয়ে চাল তৈরি করা হয়। এই চাল দিয়ে গ্রামবাংলার মানুষ বানাতেন খই ও নাড়ু। ঢ্যাপের খই ছিল শিশু ও বয়স্ক সবার পছন্দের খাবার। কৃষক পরিবারের অভাবের সময়ে ঢ্যাপ ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভরসা। কৃষক জব্বার আলী স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘যখন অভাব দেখা দিত তখন আমরা শাপলার ঢ্যাপ দিয়ে ভাত ও খই বানিয়ে খেতাম। এখন তো এগুলো চোখেই পড়ে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশে বাড়তি জনসংখ্যার কারণে আবাদি জমি ভরাট করে ঘরবাড়ি, পুকুর ও মাছের ঘের তৈরি হচ্ছে। এতে খাল-বিলের পরিমাণ কমছে। শাপলার জন্মানোর জায়গা দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে। সে কারণেই জাতীয় ফুল শাপলা ও ঢ্যাপ হারিয়ে যাচ্ছে।’
শুধু খাল-বিল ভরাট নয়, জমিতে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের ফলেও ঢ্যাপের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এতে আরও যোগ হয়েছে। প্রাকৃতিক জলাভূমি ধ্বংস হওয়ায় শাপলা-ঢ্যাপ উৎপাদন কমে যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে।
টাঙ্গাইল কৃষি বিভাগের উপপরিচালক আশেক পারভেজ বলেন, ‘আমাদের অনেক কিছু এখন বিলুপ্তির পথে। তবে সরকার চাইলে কৃষি অফিস থেকে আমরা শাপলা-ঢ্যাপ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।’
শাপলা দেশের জাতীয় ফুল। অথচ আজ তা টিকিয়ে রাখা নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। প্রকৃতির এই সম্পদ হারিয়ে গেলে শুধু একটি ফুলই বিলীন হবে না, বিলীন হবে এক টুকরো গ্রামীণ ঐতিহ্য, হারিয়ে যাবে একসময়ের বহুল ব্যবহৃত পুষ্টিকর খাদ্য এবং চিকিৎসার সহজ উপাদান।
পরিবেশবিদরা বলছেন, জলাভূমি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই। না হলে আগামী প্রজন্মের কাছে শাপলা-ঢ্যাপ শুধুই বইয়ের পাতার ছবি হয়ে থাকবে।