সিলেটে আলোচিত সাদাপাথর লুটের মূলহোতা হিসেবে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব-৯) হাতে গ্রেপ্তার সাহাব উদ্দিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও আওয়ামী লীগ সরকার আমলে পাথর ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সাদাপাথর মহালে বোমা মেশিন সিন্ডিকেট, চুনাপাথর আমদানির ব্যবসা, স্থলবন্দরের সরকারি জমি দখল করে ভাড়া দেওয়া- সবই ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলেমিশে। এমনকি উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছিলেন তার পাথর সিন্ডিকেটের প্রার্থীকে জিতিয়ে দিতে। বিনিময়ে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে সাহাব উদ্দিন ধনী হয়েছেন। তবে ‘ধরা’ পড়েছেন আওয়ামী লীগের পতনের পর। বিএনপি নেতা হিসেবে যখন একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছিলেন, তখন তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের মধ্যেও তিনি প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রেখেছিলেন।
কিন্তু গত ১১ আগস্ট বিএনপি থেকে তার পদ স্থগিত হতেই তিনি বিপাকে পড়েন। সাদাপাথরকাণ্ডে দলীয় পদ হারানোর এক মাস পর গত ১৩ সেপ্টেম্বর র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হন। র্যাব-৯-এর মিডিয়া সেল থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সাহাব উদ্দিনকে সিলেটের প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর লুটের ‘মূলহোতা’ বলে উল্লেখ করা হয়।
জানা গেছে, ভোলাগঞ্জ পাথর মহালে শ্রমিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সাহাব উদ্দিন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে শ্রমিক পরিচয়টি মুছে ফেলার সুযোগ আসে। শ্রমিক থেকে পাথর ব্যবসায়ী যাত্রায় ২০০১ সালে নিজ দল বিএনপি ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে ব্যবসায়ী পরিচয়টি আরও পাকাপোক্ত হয়। এরপর আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতাসীন হলে বোমা মেশিন চক্রে পাথর ব্যবসা শুরু করেন। একপর্যায়ে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আঁতাত করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে বিজয়ী করে দেওয়ার সুযোগে পাথর ব্যবসায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে সহযাত্রী হন।
এ সময় আওয়ামী লীগের আশীর্বাদে চুনাপাথর আমদানি ব্যবসায় জড়িয়ে সরকারি খাসজমি দখল করে ভাড়ায় খাটান। গড়ে তোলেন স্টোন ক্রাশার মিল, পেট্রোল পাম্পসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। পাথর ব্যবসায় ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে সাহাব উদ্দিন নিজ এলাকাসহ সিলেট নগরীতে বহুতল বাড়ি করেন। এভাবে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ধনী সাহাব উদ্দিন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আলোচিত হন। ভোলাগঞ্জে সাদাপাথর রিসোর্টে হামলা, স্থলবন্দর পুলিশ ফাঁড়ি ভাঙচুরের পর বাংলাদেশ রেলওয়ের সংরক্ষিত এলাকা রোপওয়ে বাঙ্কারের দখল নেন। সেখান থেকে পাথর লুটের নিয়ন্ত্রক হওয়ার মাত্র এক বছরের মাথায় বিএনপি থেকে তার পদ স্থগিত করা হয়।
১১ আগস্ট বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে সাহাব উদ্দিনের সব পদ স্থগিত করা হয়। দলীয় পদ স্থগিতের পরই পাথর লুটের তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এক সপ্তাহ পর দুদকের প্রাথমিক তদন্তে পাথর লুটেরা তালিকায় নাম আসে সাহাব উদ্দিনের। এ সময় আওয়ামী লীগ সরকার আমলে তার ধনী হওয়ার তথ্যটি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ হয়।
দুদক ও গোয়েন্দা অনুসন্ধান সূত্র থেকে জানা গেছে, সাহাব উদ্দিন ২০১৪ সালে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাসীন একটি চক্রের সঙ্গে আঁতাত করেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রার্থীর চেয়ারম্যানকে হারিয়ে পাথর সিন্ডিকেটের প্রধান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাজি শামীম আহমদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পেছনে সাহাব উদ্দিনের যোগসাজশ ছিল।
সূত্র জানায়, ওই নির্বাচন শেষে ক্ষমতাসীন দলের দাপটে একচেটিয়ে পাথর ব্যবসায় সাহাব উদ্দিন সিলেট নগরীর খাসদবির এলাকায় পাঁচতলা বাড়ি করেন। এর আগে নিজ এলাকা ভোলাগঞ্জে চারতলা বাড়ি, সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে পেট্রোল পাম্প ও স্টোন ক্রাশার মিল স্থাপন করেন। সিলেট নগরীর আম্বরখানার ইস্টার্ন প্লাজা, শাহপরান এলাকায় হিলভিউ টাওয়ারের পাশে ১০০ শতক জায়গা ও কোম্পানীগঞ্জে এম সাইফুর রহমান ডিগ্রি কলেজের পাশে ৪০ কেয়ার জায়গার মালিক হন।
তবে ২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা সাহাব উদ্দিন হলফনামায় উল্লেখ করেন, সেবা স্টোন ক্রাশার, সেবা ফিলিং স্টেশন ও সেবা এন্টারপ্রাইজ লি. আমদানিকারক নামের তিনটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি। বার্ষিক আয় দুই লাখ টাকা। ব্যাংকে জমা টাকার পরিমাণ ১০ লাখ ৭৩ হাজার ১০৬ টাকা। একটি দালান ঘরের মালিক। এটির মূল্য দেখানো হয়েছে ১৫ লাখ টাকা। ৭ দশমিক ২০ শতক কৃষি ও ২ দশমিক ২২ একর অকৃষি জমির মালিক তিনি। কৃষি-অকৃষি জমির মূল্য দেখিয়েছেন মাত্র ১৫ লাখ টাকা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সাহাব উদ্দিনের প্রভাব বিস্তার সম্পর্কে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্র থেকে তদন্তের জন্য জেলা নেতাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। জেলা নেতারা এ বিষয়ে নীরব থাকায় আইনজীবীদের মাধ্যমে একটি কমিটি হয়। ওই কমিটির পাঠানো প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সরকারি খাস জমি দখল করে শত শত বিঘা এলাকায় পাথরের মজুত ক্ষেত্র বানান। প্রতি বিঘায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা ভাড়ায় জমি দিয়ে মাসে কোটি টাকা আয় করতেন। এ টাকার ভাগ তখন আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে যেত। ভোলাগঞ্জ চুনাপাথর আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতির পদ বাগিয়ে নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন এমপি ও মন্ত্রী ইমরান আহমদের ডিও লেটারের মাধ্যমে (প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, স্মারক নম্বর : ৪৯)।
ভোলাগঞ্জে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে নির্মিত সাদাপাথর রিসোর্টে পার্টনারশিপ হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর। বিনা টাকায় পার্টনারশিপ নিতেই সাহাব উদ্দিন দলীয় অনুসারীদের নিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় রিসোর্ট ভাঙচুর করেন। এতে প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এ ঘটনায় মামলা করতে চাইলে সাহাব উদ্দিন রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে একটি বেনামে জিডি করতে বাধ্য করেন মালিকপক্ষকে।
সাদাপাথর রিসোর্টে হামলার ঘটনায় দায়ের করা জিডির বিষয়ে রবিবার যোগাযোগ করলে কোম্পানীগঞ্জ থানার নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রতন শেখ খবরের কাগজকে জানান, তিনি সম্প্রতি থানায় যোগ দিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না। ওসি বলেন, ‘জিডি তদন্ত করে সত্যতা পেলে মামলায় রূপান্তর করা যাবে।
সাহাব উদ্দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ
সাহাব উদ্দিনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় পুলিশ। গত রবিবার তাকে আদালতে হাজির করে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে পুলিশ। সিলেট মহানগর পুলিশের পরিদর্শক (কোর্ট) মো. জামশেদ আলম এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৭ এ আসামি সাহাব উদ্দিনকে হাজির করা হলে বিচারক তাকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রিমান্ড শুনানির তারিখ এখনও নির্ধারিত হয়নি।
সাদাপাথর লুটকাণ্ডের মূলহোতা হিসেবে পরিচিত সাহাব উদ্দিনকে গত শনিবার রাতে র্যাব-৯ এর একটি দল সিলেট নগরী থেকে গ্রেপ্তার করে।