বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলার সীমান্ত রেখা হিসেবে পরিচিত কালিজিরা নদী। এই নদী দিয়ে একসময় দোতলা লঞ্চ, পণ্যবাহী জাহাজ ও জ্বালানি ট্যাংকার চলাচল করত। সেই খরস্রোতা নদী এখন স্বাভাবিক পানির প্রবাহ ও নাব্য হারিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। একসময় কৃষিপ্রধান এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকায় সহায়ক ভূমিকা রাখলেও কালের বিবর্তনে সেই জৌলুশ এখন হারিয়ে গেছে। আশির দশকের প্রজন্ম উচ্ছল এই নদীকে দেখেছিল। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম বিশ্বাসই করতে চায় না এখানে কোনো নদী ছিল।
জানা গেছে, বরিশাল নগরীর জাগুয়া এলাকার কীর্তনখোলা থেকে উৎপত্তি হয়ে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটি দুই জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বরিশালের উজিরপুরের কমলাপুর এলাকায় সন্ধ্যা নদীতে মিশেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উজিরপুরের সন্ধ্যা নদীর মোহনা থেকে গুঠিয়া ইউনিয়নের পঞ্চগ্রাম পর্যন্ত নদীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। এর দুই পাশে জেগে ওঠা চর স্থানীয়রা দখল করে বসবাস করছেন। পাশাপাশি চরের জমিতে তারা চাষাবাদ করছেন। কোনো কোনো স্থানে গড়ে উঠেছে বাগানবাড়ি। নদীটির তলদেশ থেকে উপরিভাগে এক থেকে তিন ফুট পর্যন্ত পানি রয়েছে। কোথাও কোথাও নদীটির অস্তিত্বই হারিয়ে গেছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, কালিজিরা নদীর দুই পাড়ের কৃষিজমি রক্ষায় ষাটের দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ বাঁধ নির্মাণ করেছিল। এ ছাড়া অতিরিক্ত পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়। যার চিহ্ন এখনো রয়েছে গুঠিয়া থেকে নবগ্রাম পর্যন্ত সড়কে।
আগে ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নদীটির দুই পাশে অর্ধশত ছোট-বড় খালের প্রবাহ ছিল। কিন্তু নাব্য হারানোর কারণে ১০ কিলোমিটার অংশে থাকা খালগুলো পানির অভাবে শুকিয়ে গেছে। নদীর তীরসংলগ্ন এলাকার প্রান্তিক চাষিরা জমিতে পানি পাচ্ছেন না। পানির অভাবে ইরি কিংবা রবিশস্য চাষে কৃষকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। এ অঞ্চলের চাষাবাদও দিন দিন কমে যাচ্ছে।
নদী গবেষক ড. অশোক বিশ্বাসের ‘বাংলাদেশের নদীকোষ’ বইতে কালিজিরা নদী নিয়ে বলা হয়েছে, ‘বরিশাল শহরের কীর্তনখোলা বা জলসিঁড়ি নদীতে পূর্বদিক থেকে প্রবাহিত হয়ে আসা সুগন্ধা নদী যেখানে মিলিত হয়েছে, সেই মিলিত স্থান থেকে উত্তরদিক দিয়ে নবগ্রামের দিকে যে নদীটি প্রবাহিত হয়েছে তার নাম কালিজিরা। এর প্রশস্ততা ও গভীরতা নেই বললেই চলে। মানে অনেকটাই কমে এসেছে। ইতিহাসে দেখা যায়, কালিজিরা একসময় প্রশস্ত ও খরস্রোতা নদী ছিল। এই নদীই বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলাকে পৃথক করেছে। এই নদীর ওপর কালিজিরা সেতু ঝালকাঠি ও বরিশালের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, আগে ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নদীটির গড় প্রশস্ততা ছিল ২৪৩ দশমিক ৮৪ মিটার। ওই সময় গভীরতা ছিল কমপক্ষে ১৮ থেকে ২০ মিটার।
গুঠিয়া ইউনিয়নের ডহরপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও নদীকুল নয়না গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান ডাকুয়া বলেন, ‘আশির দশকের পরের প্রজন্ম খরস্রোতা কালিজিরা নদীর উত্তলতা দেখেনি, শুধু শুনেছে। নব্বইয়ের দশকের পরের প্রজন্ম কালিজিরা নদীকে মরা খাল হিসেবে দেখছে। আর বর্তমান প্রজন্ম তো কালিজিরা যে একটি নদী ছিল তা বিশ্বাসই করতে চায় না।’ তিনি জানান, বরগুনা, ঝালকাঠি থেকে ঢাকায় যাতায়াতের জন্য সহজ নৌপথ হিসেবে এই নদী দিয়ে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী বড় বড় নৌযান চলাচল করত।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার পঞ্চগ্রামের বাসিন্দা মাহমুদা পারভীন বলেন, ‘ছোটবেলায় লঞ্চে করে উজিরপুর হয়ে বানারীপাড়াতে নানার বাড়িতে যেতাম। এখন সেই নদী আর নেই। মরা খালে পরিণত হয়েছে। এ প্রজন্মের কাছে ওই নদীর কথা বললে তারা গল্প মনে করে।’
গুঠিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আরঙ্গজেব বলেন, ‘কালিজিরা নদী এখন যৌবনহারা মরা একটি খাল। এলাকার কৃষির কথা চিন্তা করে হলেও এই নদীটির খনন জরুরি। তাহলে ছোট নৌযানও চলতে পারবে।’
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘কালিজিরা নদীর কোনো কোনো স্থানে পানির প্রবাহ থাকলেও কোথাও কোথাও পলি জমে নাব্য হারিয়েছে। নদীটি সার্ভে করে অতিত ও বর্তমান পরিস্থিতি তুলনা করে দেখব। সেই অনুযায়ী প্রকল্প তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাব।’