গ্যাসের মজুদ এবং চাপ কমে উৎপাদন কমছে দেশের সবেচেযে প্রাচীন এবং বড় তিতাস গ্যাস ফিল্ডে। জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ ৬০০ পিএসআই হলেও তিতাসের বেশিরভাগ কূপ থেকে সেই চাপে গ্যাস তোলা যাচ্ছে না। এতে করে সামগ্রিকভাবে গ্যাসের উৎপাদন কমছে। এ অবস্থায় চাপ বাড়িয়ে কূপের গ্যাস তোলার পাশাপাশি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে ওয়েলহেড কম্প্রেসর স্থাপন প্রকল্প নিয়েছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) কর্তৃপক্ষ।
ইতোমধ্যে তিতাস গ্যাস ফিল্ডের পাঁচটি কূপ থেকে ওয়েলহেড কম্প্রেসরের মাধ্যমে গ্যাস তোলা হচ্ছে। এর ফলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ২২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করে দেওয়া হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। এছাড়া নতুন মজুদ খুঁজতে থ্রিডি সিসমিক সার্ভে করে নতুন আরও কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে বিজিএফসিএল কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ, মেঘনা, কামতা ও নরসিংদী গ্যাস ফিল্ড বিজিএফসিএলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে তিতাস সবচেয়ে বড়। ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের শেল অয়েল কোম্পানি এই গ্যাসক্ষেত্রটি আবিষ্কার করে। তিতাসের ২৭টি কূপের মধ্যে বর্তমানে উৎপাদনে আছে ২২টি, যেগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। নানা কারণে বাকি পাঁচটি কূপ বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ সার্ভে অনুযায়ী তিতাসের কূপগুলোতে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ রয়েছে।
তবে দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস উত্তোলনের ফলে তিতাসের সবকটি কূপেই গ্যাসের মজুদ কমছে। এর ফলে কমেছে গ্যাসের চাপ। এতে করে কূপগুলো থেকে সক্ষমতা অনুযায়ী গ্যাস তোলা যাচ্ছে না। এছাড়া ধারাবাহিকভাবে চাপ কমায় জাতীয় গ্রিডের চাপের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্যাস তুলতেও বেগ পেতে হচ্ছিল বিজিএফসিএল কর্তৃপক্ষকে। গেল কয়েক বছর ধরেই এই সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ অবস্থায় চাপ বাড়িয়ে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্যাস উত্তোলনে ওয়েলহেড কম্প্রেসর স্থাপন প্রকল্প নেয় বিজিএফসিএল। ৫৬১ কোটি টাকা ব্যায়ে গেল বছরের ফেব্রুয়ারিতে ছয়টি কম্প্রেসর স্থাপন কাজ শুরু হয়। বিজিএফসিএলের নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় অবস্থিত তিতাস গ্যাস ফিল্ডের লোকেশন ‘ই’- তে তিনটি এবং খাঁটিহাতা এলাকায় অবস্থিত লোকেশন ‘জি’- তে তিনটি কম্প্রেসর স্থাপন করা হয়েছ।
মূলত কূপে গ্যাসের চাপ হ্রাস পেলে কূপের গ্যাস ওয়েলহেড কম্প্রেসর ইউনিটের মধ্যে এনে চাপ বৃদ্ধি করা হয়। এর মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের চাপ অনুযায়ী গ্যাস উত্তোলন করে সরবরাহ করা যায়। বর্তমানে তিতাসের ১১, ১২ ও ১৭, ১৮ এবং ২৭ নম্বর কূপ থেকে ওয়েলহেড কম্প্রেসরের মাধ্যমে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে।
ওয়েলহেড কম্প্রেসর স্থাপনের পূর্বে তিতাসের ১১, ১২, ১৭, ১৮ এবং ২৭ নম্বর কূপ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা যেত। সম্প্রতি কম্প্রেসর স্থাপনের পর অতিরিক্ত আরও ২২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা যাচ্ছে। যার মাধ্যমে তিতাস গ্যাস ফিল্ড থেকে গ্যাসের উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে।
তিতাস গ্যাস ফিল্ডে ওয়েলহেড কম্প্রেসর স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুন আজাদ বলেন, ওয়েলহেড কম্প্রেসর স্থাপনের প্রধান উদ্দেশ্য গ্যাসের উৎপাদন স্বাভাবিক এবং অব্যাহত রাখা। তিতাসের ওই পাঁচটি কূপে পর্যাপ্ত গ্যাস থাকলেও চাপ কম থাকার কারণে উৎপাদন কম হচ্ছিল। এখন সেই সমস্যা কেটে গেছে। তিতাসের লোকেশন ‘ই’- তে বসানো তিনটি কম্প্রেসরের প্রতিটি ৪০ মিলিয়ন এবং লোকেশন ‘জি’- তে বসানো বাকি তিনটির প্রতিটি দৈনিক ২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের সক্ষম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন বলেন, ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে বিজেএফসিএল পরিচালিত গ্যাস ফিল্ডগুলোর বন্ধ কূপগুলো ওয়ার্কওভার প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া নতুন কোথাও গ্যাসের মজুদ আছে কিনা- সেটি অনুসন্ধানের জন্য থ্রিডি সিসমিক সার্ভে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছ। এর মাধ্যমে ১৪৫০ স্কয়ার কিলোমিটার এলাকা সার্ভে করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘সার্ভের মাধ্যমে আমরা জানতে পারব নতুন কোনো মজুদ আছে কিনা। যদি থাকে সেখানে মজুদের পরিমাণ কেমন। সার্ভে রিপোর্ট পাওয়ার পর নতুন আরও কিছু কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে’।
মাহফুজ/