নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার রাস্তার সংস্কার কাজ না করেই ঠিকাদার লাপাত্তা হয়ে গেছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় মানুষ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০ কিলোমিটার রাস্তার কাজ করলেও বাকি অংশ কাজ না করায় পোড়াহাট, ঢেলাপীর বাজার, হাজারীহাট বাজারসহ রংপুর জেলার তারাগঞ্জ বাজারের সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিপর্যয় নেমে এসেছে। হাজারীহাট থেকে তারাগঞ্জ বাজার পর্যন্ত ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার রাস্তা এখন খানাখন্দে ভরা। রিকশাচালক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন এই রাস্তা দিয়ে।
সৈয়দপুর উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, পোড়াহাট–ঢেলাপীর বাজার–হাজারীহাট বাজার হয়ে রংপুর জেলার তারাগঞ্জ বাজার পর্যন্ত মোট ১৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২১–২২ অর্থবছরে সংস্কারের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ২১ কোটি ৩৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকায় নীলফামারীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসলাম ব্রাদার্স ও মেসার্স কেবিসি (জেবিসি)-কে কাজ দেওয়া হয়।
২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কার্যাদেশ দেওয়া হলে চলতি বছরে তারা কাজ শুরু করে। ২০২৩ সালের ৬ আগস্ট কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তারা কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। পরে সময় বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ঠিকাদার কাজ না করে লাপাত্তা হয়ে যায়।
স্থানীয়রা জানান, ঠিকাদার নীলফামারী জেলার আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় যে ১০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে তাও মানসম্মত নয়। বাকি ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার কাজ না করেই তারা উধাও। হাজারীহাট থেকে খাতামধুপুর ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত রাস্তার অবস্থা সবচেয়ে করুণ। এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করে। জেলার সবচেয়ে বড় ঢেলাপীর হাটও এই রাস্তার পাশেই। রাস্তাটি ভেঙে বড় বড় গর্ত আর খানাখন্দে পরিণত হওয়ায় চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা।
ভ্যানচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এ রাস্তায় ভ্যান চালাতে খুব কষ্ট হয়। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদের সামনে প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রতিদিন কোনো না কোনো যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়। আয়ও কমে গেছে।
পথচারী বাবুল হোসেন বলেন, রাস্তা যেন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঠিকাদার পালিয়ে যাওয়ায় দুই বছর ধরে কাজ বন্ধ। শুধু শুনি—আজ কাজ হবে, কাল কাজ হবে—কিন্তু কিছুই হয় না।
পলিপাড়ার বাসিন্দা মাহাবুল হোসেন বলেন, কোনো রোগীকে এই রাস্তা দিয়ে গাড়িতে নেওয়া যায় না। বয়স্ক মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান। ধুলোবালি আর ভাঙাগড়ার কারণে রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
হাজারীহাট বাজারের ব্যবসায়ী সাদিকুল ইসলাম বাবু জানান, যত দিন যাচ্ছে ততই বাড়ছে রাস্তার গর্ত। ঠিকাদার যে অল্প কাজ করেছিল, সেটুকুও নষ্ট হওয়ার উপক্রম। দ্রুত রাস্তাটি পুনরায় নির্মাণ করা জরুরি।
পোড়াহাট বাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাকিব হোসেন বলেন, শুধু আশ্বাস পাই, কাজ হয় না। বর্ষাকালে চলাচল করতে ভয়ানক কষ্ট হয়। নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটে। আমরা চাই দ্রুত রাস্তাটি সংস্কার করা হোক।
বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান জুন বলেন, পোড়াহাট–তারাগঞ্জ রাস্তাটি একটি ব্যস্ততম সড়ক। প্রতিদিন প্রায় দশ হাজার মানুষ চলাচল করেন। নতুন করে দরপত্র দিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করা জরুরি।
হাজারীহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ লতিফর চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার বেহাল অবস্থা। খেটে খাওয়া মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে। দ্রুত সংস্কারের জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসলাম ব্রাদার্স ও মেসার্স কেবিসি (জেবিসি)-এর স্বত্বাধিকারী হাজী মিজানুর রহমান মিজানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ থাকায় মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী আলী রেজা রাজু বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করতে অপারগতা প্রকাশ করায় কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন এস্টিমেট পাঠানো হয়েছে। কাজ শেষ না করায় ঠিকাদারকে ৭৭ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। খুব দ্রুত নতুন দরপত্র দিয়ে কাজ শুরু করা হবে।
মমিনুর/মেহেদী/