‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত-যৌবনা’ বইপড়া গল্পে সৈয়দ মুজতবা আলী ফারসি কবি ওমর খৈয়ামের লেখা থেকে এভাবেই ভাবানুবাদ করেছেন।
বই হলো জ্ঞানের আঁধার। আর জ্ঞানের ভান্ডার হলো একটি পাঠাগার।
পাঠাগারকে জ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য ও বিজ্ঞানের আঁধার বলা হয়। এটি একটি জাতির মেধা, মনন, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঝিনাইদহ জেলার শিক্ষা, দীক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতির উন্নতির মূলে এই পাঠাগারগুলো অনেক ভূমিকা রেখে চলেছে। এ জেলার একটি উপজেলা শৈলকুপা। শৈলকুপা উপজেলাকে সন্ত্রাসের জনপদ, আত্মহত্যার রাজধানী বলা হলেও জ্ঞান বিস্তারে এ উপজেলায় তিনটি সরকারিসহ মোট ১৫টি মহাবিদ্যালয়, ১টি সরকারিসহ ৬৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। দেড় শতাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় ও মাদরাসাসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ উপজেলায় নানা সময়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু পাবলিক লাইব্রেরি। সঠিক পরিচর্যা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলেও উপজেলাজুড়ে নীরবে-নিভৃতে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে প্রায় ১৫টি বেসরকারি পাঠাগার। খবরের কাগজ-এর অনুসন্ধানে এর পুরো চিত্র উঠে এসেছে।
শৈলকুপা উপজেলার ৫ নম্বর কাঁচেরকোল ইউনিয়নের কচুয়া বাজারে ডাকুয়া নদীর পাড়ে ব্রিটিশ আমলে ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এন এম খান পাবলিক লাইব্রেরি অ্যান্ড ভিলেজ হল। জানা যায়, ১৯৩৬ সালে এটির গোড়াপত্তন করেন কাঁচেরকোলের জমিদার খান বাহাদুর কাজী সরোয়ার উদ্দিন ও ডাক্তার হাবিবুর রহমান।
পরবর্তী সময়ে ১৯৪২ সালে তৎকালীন যশোর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিয়াজ মোহাম্মদ খান (এন এম খান) বেণীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসে পাঠাগারটি পরিদর্শন করে পাঠাগারটির উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ দেন। সে সময় ১০ শতক জমির ওপর একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। এলাকাবাসী তার এ উদ্যোগকে স্মরণীয় করে রাখতে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ লাইব্রেরির নামকরণ করেন এন এম খান পাবলিক লাইব্রেরি অ্যান্ড ভিলেজ হল কাঁচেরকোল। দিনে দিনে বাড়তে থাকে লাইব্রেরিটির কলেবর। অনেক দুষ্প্রাপ্য বইতে ভরে ওঠে লাইব্রেরি। সঙ্গে সঙ্গে পাঠকও বাড়তে থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে পাঠক আসতে থাকে পাঠাগারটিতে।
এক সময় এ লাইব্রেরির নাম ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। সে যুগে লাইব্রেরিতে আনা হয় রেডিও। সন্ধ্যায় খবর শুনতে লোক ভিড় করত লাইব্রেরিতে। বই ও খবরের কাগজ পড়তে এবং রেডিওর খবর শুনতে ৮-১০ মাইল দূর থেকেও লোক আসত এই লাইব্রেরিতে।
কাঁচেরকোল জমিদার বাড়ির সন্তান মলি মিয়া সাহেব লাইব্রেরিকে আঁকড়ে ছিলেন বহুদিন।
তার মৃত্যুর পর লাইব্রেরি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ১৯৯৮ সালের দিকে কচুয়া গ্রামের লোকজন দাবি করেন গ্রন্থাগারটি কচুয়া বাজারে প্রতিষ্ঠিত, তাই এর দেয়ালে কচুয়া লিখতে হবে। এই নিয়ে কচুয়া আর কাঁচেরকোল গ্রামের লোকজনের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। আর এই বিরোধের জেরে ওই বছরই কচুয়ার স্থানীয় লোকজন গ্রন্থাগারটি বন্ধ করে দেন। এরপর কোনো পক্ষই সমাধানে আসতে না পারায় এটি আর চালু হয়নি। সেই থেকে বন্ধ থাকে জনপ্রিয় লাইব্রেরিটি।
দীর্ঘ ২৬ বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাইমুর রশিদ আরাফাতের নেতৃত্বে এটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল মো আসাদুজ্জামানের দিক-নির্দেশনায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার স্নিগ্ধা দাস সার্বিক সহযোগিতা করে লাইব্রেরিটি চালু করেন। আবার পাঠকের আনাগোনা শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী লাইব্রেরিটিতে।
শৈলকুপা উপজেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শৈলকুপা পাবলিক হল ও লাইব্রেরি। ১১ শতক জমির ওপর সে সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক নেতারা লাইব্রেরিটি গড়ে তোলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় লাইব্রেরির বইপুস্তক-আসবাবপত্র লুটপাট হয়ে যায়। বই পড়ার বদলে এখানে শুরু হয় অসামাজিক কার্যকলাপ। ১৯৮৬ সালে একটি নতুন একতলা ভবন তৈরি হলেও লাইব্রেরিটি পুরোপুরি চালু না হয়ে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে। ১৯৯৩ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার নলিনী রঞ্জন বসাক ও তৎকালীন এমপি আব্দুল ওহাবের পৃষ্ঠপোষকতায় এটি আবার চালু হয়। চেয়ার, টেবিল, বুকশেলফ তৈরি করা হয়। সংগ্রহ করা হয় প্রায় ২০০০ বই। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০০৮ সাল থেকে লাইব্রেরিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন স্বপন বাগচী। তার নেতৃত্বে এলাকার বিশিষ্টজনদের অংশগ্রহণে একতলা ভবন থেকে ৯ শতাংশ জমির ওপর গড়ে উঠেছে একটি দ্বিতল ভবন। ঢাকা ওয়াসার সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ড. গোলাম মোস্তফার আর্থিক সহযোগিতায় আধুনিকায়ন করা হয়েছে লাইব্রেরিটি। প্রকৌশলী ড. গোলাম মোস্তফার নামে এখানে একটি মিলনায়তন করা হয়েছে। লাইব্রেরিতে ৩ হাজার বই রয়েছে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয়টি জাতীয় পত্রিকা রাখা হয়। একজন নিয়োগ করা লাইব্রেরিয়ান এটি দেখভাল করেন।
শৈলকুপার উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে কবি গোলাম মোস্তফার বাস্তুভিটায় ১৯৬৮ সালে কবি গোলাম মোস্তফা স্মৃতি গণপাঠাগারটি গড়ে তোলা হয়। দীর্ঘদিন পর সরকারি উদ্যোগে এখানে একটি ভবন তৈরি হয়েছে। স্থায়ী লাইব্রেরিয়ান না থাকায় নিয়মিত খোলা হয় না। গ্রাম্য রাজনীতির কারণে লাইব্রেরিটি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এটি আবার চালু করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ৩ লাখ টাকার অনুদানের ব্যবস্থা করা হয় লাইব্রেরিটিতে। বর্তমানে পাঠাগারটি নিয়মিত খোলা রাখা হয়, বই ধার, দৈনিক পত্রিকা পড়তে পাঠক আসতে শুরু করেছে।
শৈলকুপা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মাঠপাড়া গ্রামের কাজী বাড়িতে ডা. কাজী খাদেমুল ইসলাম পাঠাগার ও উন্নয়ন সংঘ নামে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন সাবেক যুগ্ম সচিব কাজী নাসিরুল ইসলাম। পাঠাগারটির আধাপাকা একটি সুদৃশ্য ভবন রয়েছে। একজন পার্টটাইম লাইব্রেরিয়ান এটি দেখাশোনা করেন। লাইব্রেরিতে দেড় হাজারের ওপর বই আছে, দৈনিক পত্রিকা রাখা হয়, নিয়মিত খোলা রাখার ব্যবস্থা আছে।
শৈলকুপা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিএসডি ক্লাব অ্যান্ড পাঠাগার। সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী আলমগীর অরণ্যের নেতৃত্বে ২০১৩ সালে গণগ্রন্থাগার থেকে এটির রেজিস্ট্রেশন করা হয় এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুদানে একটি আংশিক পাকা দোচালা টিনের ঘর তৈরি করে লাইব্রেরিটি চালু করা হয়। ২ হাজারের ওপর বই আছে লাইব্রেরিটিতে। সার্বক্ষণিক লাইব্রেরিয়ান নেই। একজন পার্টটাইম লাইব্রেরিয়ান এটি দেখাশোনা করেন। বর্তমানে লাইব্রেরিটির স্থায়ী ভবন নির্মাণকাজ চলমান। প্রতিদিন তিনটি দৈনিক পত্রিকা রাখা হয়।
শৈলকুপা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তরপাড়া গ্রামে ২০০৯ সালে শৈলকুপা পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত ক্রীড়া ও স্কাউট শিক্ষক আতিয়ার রহমান তার কাচারী ঘরে প্রতিষ্ঠা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আতিয়ার রহমান পাঠাগার, তিনিই এটি দেখভাল করতেন। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে ব্যাংকার ফজলুর রহমান এটি পরিচালনা করেন। বর্তমানে পাঠাগারের নিজস্ব একটি আধাপাকা ঘর রয়েছে। একজন পার্টটাইম লাইব্রেরিয়ান এটি দেখাশোনা করেন। প্রতিদিন দৈনিক পত্রিকা রাখা হয়। প্রায় দেড় হাজারের ওপর বই রয়েছে পাঠাগারটিতে।
শৈলকুপা উপজেলার ১ নম্বর ত্রিবেণী ইউনিয়নের পদমদী গ্রামে কৃতী শিক্ষক আকবর আলীর নামে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আকবর আলী পাঠাগার। গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রেশন করা পাঠাগারটির কার্যক্রম চলে একটি টিনের ঘরে। কে এম শরীফুল ইসলাম ও শিক্ষক আব্দুল হান্নান এটি পরিচালনা করেন। প্রায় ২ হাজার বই রয়েছে পাঠাগারটিতে।
উপজেলার ৬ নম্বর সারুটিয়া ইউনিয়নের কাতলাগাড়ি বাজারে ইঞ্জিনিয়ার নাজমুল আলম খোশবু ২০১৯ সালে গড়ে তোলেন কাতলাগাড়ি পাবলিক লাইব্রেরি। ২০২৩ সালে লাইব্রেরিটি গণগ্রন্থাগারের তালিকাভুক্ত হয়। ৬৫০ বই নিয়ে ভাড়া করা ঘরে চলে লাইব্রেরির কার্যক্রম।
উপজেলার ২ নম্বর মির্জাপুর ইউনিয়নের সাধুখালী গ্রামে ২০১০ সালে ভেলা মহিলা সমিতির পরিচালক শোলকী খাতুন নিজ উদ্যোগে গড়ে তোলেন ভেলা পাঠাগার। ২০১৩ সালে পাঠাগারটি গণগ্রন্থাগারের তালিকাভুক্ত হয়। ৭৫০ বই রয়েছে পাঠাগারটিতে। সমিতির সদস্য ছাড়াও গ্রামের পাঠকরা এখান থেকে বই নিয়ে পড়াশোনা করে।
উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের গোলকনগর গ্রামে নিজ বাড়ির আঙিনায় ২০১৪ সালে গোলাম রসুল স্মৃতি পাঠাগারটি গড়ে তোলেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত আলীনুর রহমান ওরফে কবি বঙ্গ রাখাল। পাঠাগারটি ২০২৫ সালে গণগ্রন্থাগারের তালিকাভুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত হয় পাঠাগারটিতে। গ্রামের ছেলেমেয়েরা পাঠাগার থেকে বই নিয়ে পড়াশোনা করেন। প্রায় ২ হাজার বই রয়েছে পাঠাগারটিতে।
উপজেলার নিত্যানন্দপুর ইউনিয়নের শেখরা গ্রামে ২০২০ সালে গড়ে ওঠে শেখরা যুব উন্নয়ন গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগারটি ২০২২ সালে গণগ্রন্থাগারের তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে গ্রন্থাগারের বই সংখ্যা ৫১০টি। এটি পরিচালনা করেন বিল্লাল হোসেন লিটু।
উপজেলার নিত্যানন্দপুর ইউনিয়নের বাগুটিয়া গ্রামে ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রজনীগন্ধা গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগারটি ২০২১ সালে গণগ্রন্থাগারের তালিকাভুক্ত হয়। গ্রন্থাগারটিতে রয়েছে ৬ শতাধিক বই। এটি পরিচালনা করেন এস এম শহিদুল ইসলাম মনি।
শৈলকুপা উপজেলার সারুটিয়া ইউনিয়নের মৌবন মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় সম্প্রতি ২০২৫ সালের শুরুতে গড়ে তোলা হয়েছে মৌবন পাঠাগার। স্কুলশিক্ষক ও শিল্পী ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বে পাঠাগারটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বই সংগ্রহ, পাঠকদের মাঝে বই বিতরণ, পত্রিকা পাঠের ব্যবস্থা রয়েছে পাঠাগারটিতে।
পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, নেতৃত্বের দুর্বলতা, সামাজিক দলাদলি বিভিন্ন কারণে উপজেলায় বেশ কয়েকটি পাঠাগার বন্ধ হয়ে আছে এর মধ্যে রয়েছে ৬ নম্বর সারুটিয়া ইউনিয়নের নাদপাড়া গ্রামে নাদপাড়া সূর্যতরুণ পাঠাগার, কাতলাগাড়ি বাজারে লেখক প্রকাশক মোহাম্মদ আলী প্রতিষ্ঠিত দুঃসাহস পাঠাগার, বড়মৌকুড়ি গ্রামের ঢাকা ক্লাব পাঠাগার, হাকিমপুর ইউনিয়নের সাধুহাটি বাজারের সাধুহাটি পাবলিক লাইব্রেরি, কবিরপুরে হাসুমনির পাঠাগার, গাড়াগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি ইত্যাদি।