২০২২-এর জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। খরচ ধরা হয় সোয়া ২৫ কোটি টাকা। কিন্তু তিন বছরে কোনো কাজ হয়নি। ফলে ছয় মাস সময় বাড়িয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা হয়। খরচও বাড়িয়ে ৩৪ কোটি টাকা ধরা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরে নির্মাণকাজই শুরু হয়নি। বলা হচ্ছে, ‘শহিদ সুকান্ত বাবু টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট, গৌরনদী’ নামে একটি প্রকল্পের কথা।
রাজনৈতিক বিবেচনায় সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ব্যক্তিগত আগ্রহেই গৌরনদী উপজেলা সদর থেকে ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে একেবারে নিচু এলাকায় প্রকল্পের স্থান নির্বাচন করা হয়। আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ। তাই আবারও দেড় বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় থেকে। খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ কোটি টাকা। প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা যাচাই করতে সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কিছু ব্যাপারে আপত্তি তুলে সংশোধন করতে বলা হয়। এটি বাস্তবায়ন করছে বস্ত্র অধিদপ্তর।
বস্ত্র খাতে শিক্ষিত ও দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে বস্ত্র অধিদপ্তর। তাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট ও টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে শিক্ষার্থীরা বস্ত্রশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নিয়োজিত হচ্ছেন। এ প্রেক্ষাপটে বরিশালের গৌরনদীতে শহিদ সুকান্ত বাবু টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট স্থাপনের উদ্যোগ নেয় বস্ত্র অধিদপ্তর। তারই অংশ হিসেবে গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ মাগুরা গ্রামে এই প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সেখানে এক একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। প্রথমে এই প্রকল্পে খরচ ধরা হয় ২৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০২২-এর জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্প ৫০ কোটি টাকার কম হওয়ায় ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী তাতে অনুমোদন দেন। কিন্তু কাজের অগ্রগতি হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পের প্রধান কাজ ছিল ছয়তলা ভিতের ওপর চারতলা একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ। এতে খরচ ধরা হয় ২৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। জমির মূল্য ৫২ লাখ টাকা। বাজেটে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ৯১টি আসবাবপত্র কেনার কথা বলা হয়। ৬৫ লাখ টাকায় ভূমি উন্নয়ন, ২১ লাখ টাকায় শহিদ মিনার নির্মাণ, ১ কোটি ১৭ লাখ টাকায় ৬৮ সেট যন্ত্রপাতি ও মেশিনারিজ কেনার কথা বলা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নির্বাচিত জমিটি ছিল খুবই নিচু এলাকায়। বছরের প্রায় আট মাস সেখানে পানি জমে থাকে। বর্ষা মৌসুমে পুরো এলাকা পানির নিচে চলে যায়। এমন বাস্তবতায় সেখানে স্থায়ী কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্ন তোলেন তারা। তারা বলেন, প্রকল্পটি দুই উপজেলার সীমান্তবর্তী হলেও সড়ক যোগাযোগ অত্যন্ত দুর্বল। গৌরনদী উপজেলা সদর থেকে ওই স্থানের দূরত্ব কমপক্ষে ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার। আবার আগৈলঝাড়া উপজেলা সদর থেকে সেখানে যাওয়ার কোনো সহজ পথ নেই। এমন অবস্থায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা কীভাবে নিয়মিত যাতায়ত করবেন, সে প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই ও বরিশাল-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ব্যক্তিগত আগ্রহেই এই জমি অধিগ্রহণ করা হয়। তবে প্রকল্পের স্থান নির্বাচন ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সুবিধার বিষয়গুলোর ওপর জোর না দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এমন একটি জমি নির্ধারণ করা হয়। ফলে কাজের কাজ কিছু হয়নি। কিন্তু খরচ বাড়ানো হয়েছে ঠিকই। এক বছর পরই সংশোধন করে খরচ বাড়িয়ে ধরা হয় ৩৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা। সময় বাড়ানো হয় ছয় মাস। ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট এর অনুমোদনও দেওয়া হয়। কিন্তু এই সাড়ে তিন বছরে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
তাই বাকি কাজ শেষ করতে এবার দেড় বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। খরচও সোয়া ২ কোটি টাকা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। একই সঙ্গে প্রকল্পের নামও পরিবর্তন করে নামকরণ করা হয়েছে বরিশাল টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট, গৌরনদী, বরিশাল স্থাপন। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা প্রকল্পটির নাম পরিবর্তন করতে সম্মতি দেন।
মেয়াদ বাড়ানোর ব্যাপারে বলা হয়েছে, প্রকল্পের মেয়াদ শুরুর প্রায় ২০ মাস পর জমির দখল বুঝে পাওয়া যায়। এরপর পূর্তকাজের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয় এবং ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ বরিশাল গণপূর্ত বিভাগ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিপত্র সম্পন্ন হয়। কিন্তু প্রকল্প এলাকা নিচু হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পানিতে নিমজ্জিত থাকে। তাই বাকি কাজ শেষ করতে এবার দেড় বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তা যাচাই করতে গত বুধবার পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মূল ভবন নির্মাণে প্রথমে ২৪ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। পরে সংশোধন করে ৫৫ লাখ টাকা বেশি ধরা হয়। এই ব্যয় বাড়ার যৌক্তিকতা জানতে চাওয়া হয় সভায়। একই সঙ্গে জমির মূল্য ৫২ লাখ টাকা প্রাক্কলন করা থাকলেও পরিশোধ করা হয়েছে ৫৬ লাখ টাকা। ৪ লাখ টাকা কেন বেশি দেওয়া হয়, সে ব্যাপারেও জানতে চাওয়া হয়। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ভূমি উন্নয়ন ছিল শূন্য পর্যায়ে। এভাবে বিভিন্ন ব্যাপারে আপত্তি করে তা সংশোধন করতে বলা হয়েছে। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) গৌরনদী উপজেলা শাখার সভাপতি জহিরুল ইসলাম জহির বলেন, ‘গৌরনদী ভোকেশনাল টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা হবে নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু যে জমি নির্বাচন করা হয়েছে, তা পরিকল্পনাগত ব্যর্থতার উদাহরণ। কারণ এখানে বছরের ৮ থেকে ৯ মাস কোমরসমান পানি থাকে। যোগাযোগব্যবস্থাও অত্যন্ত দুর্বল। এমন জায়গায় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো, সেটাই বড় প্রশ্ন।’
আগৈলঝাড়া উপজেলার বাসিন্দা মো. আজাদ বলেন, ‘এ ধরনের প্রতিষ্ঠান চালু হলেও শিক্ষার্থীরা ভর্তি হবে কি না, তা নিয়েই সন্দেহ রয়েছে। কারণ যোগাযোগব্যবস্থার যে অবস্থা, তাতে পুরো প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।’ দক্ষিণ মাগুরা গ্রামের বাসিন্দা যতীন চন্দ্র দাশ বলেন, ‘একসময়ে শুনেছিলাম এখানে একটি টেক্সটাইল কলেজ হবে। জমি অধিগ্রহণও হয়েছে। কিন্তু এরপর আর কোনো খবর নেই। জমিটা এখনো বিলের অংশ হিসেবেই পড়ে আছে।’
সার্বিক ব্যাপারে জানতে প্রকল্প পরিচালক ও বস্ত্র অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি অল্প কয়েক দিন হলো দায়িত্ব নিয়েছি। তাই বলার মতো সবকিছু বুঝে উঠতে পারিনি। সময় হলে সবকিছু বলা যাবে।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বরিশাল থেকে (নিজস্ব প্রতিবেদক) মঈনুল ইসলাম সবুজ