পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় গঙ্গামতিসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চল বহুমুখী সংকটে পতিত হয়েছে। এসব বনাঞ্চল এখন বিলীন হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে। একে তো সাগরের অব্যাহত ভাঙনে কুয়াকাটার লেম্বুরচর থেকে পর্যটনপল্লী গঙ্গামতি লেকপাড় পর্যন্ত সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অর্ধেকটা বিলীন হয়ে গেছে। তার ওপরে বিভিন্ন আবাসন কোম্পানির দখলে চলে গেছে বেড়িবাঁধের বাইরের ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনাঞ্চলসহ খালবিল প্লাবনভূমি।
প্রভাবশালী মহল ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল থাকা এই প্লাবনভূমি, খাল, সরকারি খাসজমি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আশপাশের এরিয়া আবাসন কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করায় এমন সংকট তৈরি হয়েছে। এরা প্রথমে বেড়িবাঁধের বাইরের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল কেটে বিরানভূমি করেছে। তারপরে পানির প্রবাহ বহমান খাল বন্ধ করে বাউন্ডারি রিংবেড়িবাঁধ দিয়ে আটকে দিয়েছে। এসব প্লাবনভূমিতে এখন আবাসন কোম্পানির শত শত সাইনবোর্ড শোভা পাচ্ছে।
তাদের অস্থায়ী অফিসঘর তোলা হয়েছে। ফলে সাগরপারের সবুজ দেয়ালখ্যাত ম্যানগ্রোভ ঘেরা সংরক্ষিত বনাঞ্চল হুমকির মুখে পড়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়াই এসব জমি হস্তান্তরে গোটা উপকূলের পরিবেশগত হুমকি ক্রমশ বাড়ছে। ফলে প্রবল ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাণঘাতী দুর্যোগে জলোচ্ছ্বাসের প্রাথমিক ঝাপটা থেকে রক্ষাকবচ সবুজ দেয়ালখ্যাত বনাঞ্চল নিশ্চিহ্নের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে ক্ষতিকর পেরেক মেরেছে জরিপ অধিদপ্তর। সর্বশেষ বিএস জরিপে গঙ্গামতির বিশালকায় দেড় হাজার একরের গেজেটভুক্ত বনাঞ্চলকে সরকারি খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন একশ্রেণির ভূমিদস্যু আবাসন কোম্পানিসহ বিভিন্ন ভূমিখেকোদের হায়ার করে ওই বনাঞ্চলসহ জমিজমার মালিকানার কাগজপত্র তৈরি করার কাজে নেমেছে। এরা সবসময় মহিপুর ভূমি অফিসে ঘুরঘুর করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে গেলে স্থানীয়রা জানান, ২০০১ সালেও কুয়াকাটা সৈকতের দুই দিকে ধুলাসার, গঙ্গামতি, কাউয়ারচর এবং পশ্চিমদিকে খাজুরা ও লেম্বুরচর বনাঞ্চলে ছিল সবুজের আস্তরণ। পরিপূর্ণ ছিল ম্যানগ্রোভ-ননম্যানগ্রোভ প্রজাতির সংরক্ষিত বনাঞ্চল। অন্তত পাঁচ হাজার একরজুড়ে এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল ছিল। ২০১০ সালের তথ্যানুসারে বন বিভাগ মহীপুর রেঞ্জের অধীন সংরক্ষিত কুয়াকাটা বিট, কুয়াকাটা ক্যাম্প, গঙ্গামতি, খাজুরা ও ধুলাসার ক্যাম্পের অধীনে বনভূমির পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৯৭৮ দশমিক ৩৩ একর। এর মধ্যে কুয়াকাটা সৈকতের কুয়াকাটা বিটের ১৯৩ একর এবং কুয়াকাটা ক্যাম্পের অধীন বনভূমির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮১৮ দশমিক ৯৩ একর। গঙ্গামতি ক্যাম্পের আয়তন কাগজে-কলমে ১১২৮ একর। কিন্তু বাস্তবে এখন এসব সংরক্ষিত বনের এক-তৃতীয়াংশ নেই। ধুলাসার ক্যাম্পের ৪৬১ একরের নেই ৫০ একরও। সব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সংরক্ষিত বিশাল এই বনাঞ্চলগুলোর অর্ধেকের বেশি ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা থেকে শুরু হয়ে সাগরের অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। অপরদিকে মানুষের দখল-দূষণেও মারা পড়ছে হাজার হাজার গাছ। গত ১০ বছর ধরেই আশপাশের বনের জমিসহ প্লাবনভূমি দখল করে নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে কৃষি ও মাছ ধরা দুটো পেশায় জড়িত আলম প্যাদা গঙ্গামতি বনের পাশে গরুকে ঘাস খাওয়াচ্ছিলেন। তিনি জানালেন, সিডরের পরেও বেড়িবাঁধের স্লোপ থেকে বাইরে সাগরের তীর পর্যন্ত গভীর বনাঞ্চল ছিল। বনের মধ্যে চলাচলে ভয় লাগত। বন্যপশুরা বসবাস করত। এখন সব উজাড় হয়ে গেছে। এভাবে চললে কয়েক বছরে বেড়িবাঁধ পর্যন্ত বিলীনের শঙ্কা রয়েছে।
তিনি জানালেন, গঙ্গামতির সংরক্ষিত বনসহ বেড়িবাঁধের বাইরের এরিয়া সব বনাঞ্চলে ঘেরা ছিল। এখন নেই। জেলেরা এর ভেতরের খাল দিয়ে সাগরে যাওয়া আসা করত। এখন ওই খালসহ জোয়ারের পানিতে ডুবে থাকা সব জমি হিসেবে কোম্পানির (আবাসন) কাছে বিক্রি করা হয়েছে। আছে শুধু তাদের সাইনবোর্ড। কুয়াকাটা ও তৎসংলগ্ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল হচ্ছে গঙ্গামতি। কিন্তু এটির এখন প্রধান সমস্যা সাগরে বিলীন হওয়ার পাশাপাশি গাছ কাটা, মাটি কাটা, দখল ও অবৈধ নির্মাণ প্রক্রিয়া।
একই দৃশ্য খাজুরা ও লেম্বুরচর বনাঞ্চলের। কাগজে-কলমে এ বনভূমির আয়তন ছিল ৩৪৬ দশমিক ৮৭ একর। এখন বাস্তবে অর্ধেকও নেই। এখন সাগর পারে চলছে ঢেউয়ের আগ্রাসন। এর সঙ্গে চলছে প্রতিটি বনের গাছপালা নিধনের তাণ্ডব। যে যেভাবে পারছে বন ধ্বংস করছে।
বাংলাদেশের আইনে সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, খাল-নদীর প্রবাহমান এলাকা, প্লাবনভূমি ও খাস জমি-এসব জায়গা সাধারণভাবে বেসরকারি হাউজিং কোম্পানির কাছে হস্তান্তরের জন্য উন্মুক্ত নয়। বরং এসব এলাকার ওপর বিশেষ সুরক্ষা ও ব্যবহার-নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
নিয়ম রয়েছে, বনভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করতে সরকারি পর্যায়ের অনুমতি নেওয়া। পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কোনো আবাসন প্রকল্প অনুমোদনযোগ্য নয়। খাল ভরাট, জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা বা বন উজাড় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রাকৃতিক পানির প্রবাহ বন্ধ করে স্থাপনা নির্মাণ বেআইনি।
ফরেস্ট অ্যাক্ট ১৯২৭ মূলত সংরক্ষিত বন ও বনজ সম্পদ রক্ষার মূল আইন। সংরক্ষিত বনভূমিতে সরকারের অনুমতি ছাড়া দখল, পরিবর্তন বা বাণিজ্যিক ব্যবহার সীমাবদ্ধ। ন্যাশনাল ল্যান্ড ইউজ পলিসি, ২০০১ মূলত জলাভূমি বনভূমি, কৃষিজমি ও প্লাবনভূমি রক্ষার নীতি নির্ধারণ করে। এতে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেনেন্সি আ্যাক্ট, ১৯৫০ এবং অন্যান্য ভূমি আইন মূলত খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় মালিকানা সম্পর্কিত বিধান নির্ধারণ করে। কিন্তু এসব আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেমন স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বনবিভাগ কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তর নির্বিকার।
এসব প্রতিপালনে সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, খালবিল জলাশয়, প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষায় বাংলাদেশ বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভূমি মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সব সময় চরম উদাসীনতার পরিচয় দিয়ে আসছে। এসব বিভাগের রয়েছে চরম সমন্বয়হীনতা। সব বিভাগের সমন্বয়ে পরিবেশ প্রতিবেশ জীববৈচিত্র, বনাঞ্চল, প্লাবনভূমি রক্ষায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ, বন উজাড় বন্ধ, প্লাবনভূমি সংরক্ষণ, জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার, পুনঃবনায়ন কার্যক্রম ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র সংরক্ষণ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সবাই ব্যস্ত শুধু চাকরি নামের সময় অতিক্রান্ত করতে। দায়বোধের জায়গা থেকে কেউ আন্তরিক নন-এমন মন্তব্য পরিবেশ সংগঠক কেএম বাচ্চুর।
বনবিভাগ মহীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গেজেটভুক্ত এলাকা সর্বশেষ জরিপে গঙ্গামতিকে খাস করা হয়েছে। দাগ খতিয়ান উল্লেখ নেই। শুধু চৌহদ্দি দেওয়া হয়েছে। অথচ একই জরিপে ধুলাসার বিটের ৪৯৮ দশমিক ০৬ একর বন বিভাগের নামে রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে গঙ্গামতির দেড় সহস্রাধিক একরজুড়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চল এ কারণে সংকটে পড়েছে। আর বনাঞ্চলসহ ম্যানগ্রোভ-ননম্যানগ্রোভ বন রয়েছে কিংবা আশপাশের প্লাবনভূমি হস্তান্তরে কখনো বন বিভাগের মতামত নেওয়া হয় না। এমন সব বাস্তবমুখী সমস্যা সমাধানে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি প্রয়োজন বলে মনে করছেন এই বন কর্মকর্তা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম জানান, বেড়িবাঁধের বাইরের অধিগ্রহণকৃত স্লোপসহ সামনের জায়গাকে বড়পিঠ বলা হয়। এসব জায়গায় একসময় প্রচুর ছইলা-কেওড়া বাগান ছিল। তা উজাড় করা হয়েছে। এখন বাঁধ থাকছে জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে। বেড়িবাঁধের বাইরে যেন কোনো ধরনের স্থাপনা তোলা না হয় এমন পরামর্শ তিনি সীবিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির একটি সভায় বলেছেন। কিন্তু এসব মানা হয় না। ফলে পর্যটন এলাকার সবুজ প্রকৃতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর বাঁধের আশপাশের জমি হস্তান্তরে তাদের কোনো পরামর্শ নেওয়া হয় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও কুয়াকাটা সি বিচ ম্যাজেমেন্ট কমিটির সদস্যসচিব কাউছার হামিদ জানান, সরকারের অনুমোদনবিহীন সংরক্ষিত বনাঞ্চল এরিয়া ও পর্যটন এলাকার কোনো জমি আবাসন কোম্পানির কাছে হস্তান্তরের সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে সরকারি নিয়মনীতি অনুসারে প্রয়োজনীয় আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বাঁধ দিয়ে উপকূল, উপকূলীয় মানুষের জীবন ও সম্পদ দুর্যোগের কবল থেকে রক্ষা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে বেড়িবাঁধের বাইরের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল প্রকৃত ‘প্রথম প্রতিরক্ষা দেয়াল’। এই প্রতিরক্ষা দেয়াল ঢেউয়ের শক্তি কমায়, জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা হ্রাস করে, মাটির ক্ষয় কমায় ও বাঁধের আয়ু বাড়ায়। মূলত বন ধ্বংস হলে বাঁধের ওপর চাপ বাড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। তাই সর্বাগ্রে ম্যানগ্রোভ, ননম্যানগ্রোভ ও উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি স্থানীয়দের।