গাইবান্ধায় জিইউকে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে মানসিক ভারসাম্যহীন যুবককে মারধর ও নির্যাতনের মামলায় ৫ আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গাইবান্ধা সদর আমলি আদালতের বিচারক অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আতিকুর রহমান এ আদেশ দিয়েছেন।
আসামিরা হলেন- জিইউকে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাধন (৩৫), লাবিব (৩২), শিহাব (৩৫), আতিফ (৩৬) ও তালহা (৩৫)।
গাইবান্ধা সদর আমলি আদালতের কোর্ট উপ-পরিদর্শক আজিজুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বেলা ১১টার দিকে গাইবান্ধা সদর আমলি আদালতে আসামিদের জামিনের আবেদন জানান আইনজীবী মনজুরুল করিম সোহেল ও আবদুর রশিদ। সাড়ে ১১টার দিকে জামিন আবেদনের ওপর শুনানি হয়। এ সময় বাদীপক্ষের আইনজীবী কাজী আমিরুল ইসলাম ফকু জামিনের বিরোধিতা করেন। আইনজীবী আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আদালত জামিন আবেদনের ওপর উভয় পক্ষের শুনানি গ্রহণ করেন। শুনানি শেষে আসামিদের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে তাদের জেলা কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরে তাদের গাইবান্ধা জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।’
মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, নির্যাতন ও মারধরের শিকার মুর্শিদ হক্কানী (৩৭) একজন মানসিক ভারসাম্যহীন প্রকৃতির ব্যক্তি। গত বছরের ২৮ আগস্ট মুর্শিদ শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে গাইবান্ধা শহরের ভি-এইড রোডে অবস্থিত গাইবান্ধার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (জিইউকে) পরিচালিত ‘জিইউকে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে’ চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসাসেবা প্রদানের সময় ওই কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তরা পরিবারের লোকজনকে তার খোঁজখবর নিতে দিতেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন অজুহাতে রোগীর সঙ্গে কথাবার্তা ও দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত ১১ ফেব্রুয়ারি বেলা আনুমানিক ২টার সময় আত্মীয়-স্বজনরা মুর্শিদ হক্কানীকে দেখতে কেন্দ্রে সাক্ষাৎ করতে চাইলে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিভিন্ন এলোমেলো ও অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকেন। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় এবং তাদের কথাবার্তা, আচরণ ও কার্যকলাপে সন্দেহ সৃষ্টি হয়।
তাকে দেখার জন্য পুনরায় অনুরোধ করলে ওই দিন বেলা আনুমানিক ৩টার দিকে মুর্শিদ হক্কানীকে দেখার সুযোগ দেওয়া হয় এবং জানানো হয় যে, তারা আর তাদের প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা করাবেন না। এ সময় মুর্শিদ হক্কানীর নাকের ওপরসহ শরীরের দৃশ্যমান বিভিন্ন স্থানে কাটা, ফোলা ও আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়।
পরে মুর্শিদকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। বাড়িতে গিয়ে তিনি জানান, কেন্দ্রের ভেতরে থাকা অবস্থায় তার ওপর শারীরিক নির্যাতন ও মারধর করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাধন, লাবিব, শিহাব, আতিফ ও তালহা তাকে কেন্দ্রের একটি আধাপাকা ঘরের ভেতরে নিয়ে মুখে কাপড় ঢুকিয়ে লোহার রড দিয়ে ডান ও বাম হাত, পিঠ, দুই উরু, দুই পায়ের হাঁটু, নাকের ওপর ও বাম হাতের তালুতে মারধর করেন। একপর্যায়ে তারা তার দুই পা রশি দিয়ে বেঁধে উল্টো করে গ্রিলের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখেন। এতে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। মারধরের পর এসব কথা পরিবারকে না জানানোর জন্য হুমকি দেওয়া হয়।
অসুস্থ অবস্থায় মুর্শিদ হক্কানীকে ১১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ১৩ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
এই ঘটনায় নির্যাতনের শিকার যুবকের বড় ভাই আওরঙ্গ হক্কানী বাদী হয়ে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধা সদর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। সাত দিন পর গত ২১ ফেব্রুয়ারি মামলাটি রেকর্ডভুক্ত করা হয়। মামলার বাদী আওরঙ্গ হক্কানী বলেন, সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে তিনি এ ঘটনার বিচার চান।
গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন মুঠোফোনে জানান, ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে।
রফিকুল/রিফাত/