ঢাকার ধামরাই উপজেলায় কয়েকটি শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত বর্জ্য পানি পাইপ দিয়ে সরাসরি গাজীখালী নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পুরোপুরি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দূষিত পানির দুর্গন্ধে এলাকায় শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন ধরনের রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে নদীর আশপাশের পরিবেশ মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া দূষণের কারণে নদীর মাছ মারা যাচ্ছে, কৃষিজমির উৎপাদন কমছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
দুর্গন্ধের কারণে নদীর আশপাশের বাড়িগুলোতে আত্মীয়স্বজনরা বেড়াতে আসতে চান না। এমনকি বিয়ের জন্য ছেলেমেয়ে দেখতে এসেও অনেক সময় বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন চিত্র দেখা গেছে উপজেলার সুতিপাড়া ইউনিয়নের বালিথা এলাকায়।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। তারা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে বর্জ্য পরিশোধনের দাবি জানিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, সুতিপাড়া ইউনিয়নের বালিথা এলাকায় তারাসিমা, আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড, গ্রাফিক্স, পাল পেপার, রেডিশন গার্মেন্টসহ কয়েকটি কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য মিশ্রিত পানি নিয়মিত পরিশোধন ছাড়াই গাজীখালী নদীতে ফেলা হচ্ছে। বর্জ্যের দুর্গন্ধে নদীর আশপাশের কয়েক শ পরিবারের বসবাস কষ্টকর হয়ে পড়েছে। নদীর পাশের সড়ক দিয়ে চলাচল করতেও মানুষকে নাক চেপে বা মাস্ক ব্যবহার করতে হচ্ছে। খাবারের সময়ও দুর্গন্ধে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কারখানার মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও মালিকপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় গাজীখালী নদীর পানি কৃষিকাজ, গোসল ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত হতো। সারা বছর মাছ পাওয়া যেত। জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন প্রতিদিন অন্তত পাঁচটি শিল্পকারখানা পরিশোধন ছাড়াই বর্জ্য ফেলছে। এতে মাছ মারা যাচ্ছে। নদীতে কালো-সাদা আস্তরণ জমে গেছে। সেখান থেকে ২৪ ঘণ্টা তীব্র দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। কৃষিজমির উৎপাদন কমছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। সব মিলিয়ে এখন নদীর পানি স্পর্শ করতে ভয় লাগে।
৭০ বছর বয়সী জয়ফুল বেগম বলেন, ‘আমরা নদীপাড়ের মানুষ বড় অসহায়। দুর্গন্ধে থাকা যায় না। বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ঘরের টিন পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছি।’
বাথুলী এলাকার দোকানদার বাবুল হোসেন বলেন, ‘অনেক প্রতিবাদ হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। জনপ্রতিনিধিরা ফ্যাক্টরিতে গিয়ে আর কিছু বলেন না।’
গ্রাফিক্স পোশাক কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা সজীব বলেন, ‘আমরা পরিশোধন করেই পানি ফেলার চেষ্টা করি। আমাদের ইটিপি প্ল্যান্ট ও বায়োলজিক্যাল সিস্টেম রয়েছে এবং পানির পিএইচ মান ঠিক আছে।’
এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ তমিজ উদ্দিন বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পায়।’
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে গাজীখালী নদী পুরোপুরি মৃত নদীতে পরিণত হতে পারে, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করবে।