চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার কয়েকটি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিতে মৃত ব্যক্তিদের সদস্য হিসেবে বহাল রাখা, একই ব্যক্তির একাধিক সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটিতে পদধারণ এবং সদস্য তালিকায় নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত, বিশেষ নিরীক্ষা (স্পেশাল অডিট) এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে রাজশাহী বিভাগীয় সমবায় কার্যালয়ে লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
আবেদনকারী মো. এমতাজ উদ্দিন সম্প্রতি রাজশাহী বিভাগীয় সমবায় কার্যালয়ের যুগ্ম নিবন্ধকের কাছে এ আবেদন করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, নাচোল উপজেলার ঘিওন মৎস্যজীবী সমিতি লিমিটেড, সোনালী জাল মৎস্যজীবী সমিতি লিমিটেড, শিবপুর-শিয়ালা মৎস্যজীবী সমিতি লিমিটেড, হুলাশপুর মৎস্যজীবী সমিতি লিমিটেড এবং কাতলাকান্দর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সদস্য তালিকা ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কাতলাকান্দর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সদস্য তালিকায় এমন একজন ব্যক্তির নাম এখনও বহাল রয়েছে, যিনি ২০২১ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন। একইভাবে ঘিওন মৎস্যজীবী সমিতির সদস্য তালিকাতেও ২০২৩ সালে মৃত্যুবরণকারী এক ব্যক্তির নাম সদস্য হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অভিযোগকারীর দাবি, মৃত ব্যক্তিদের সদস্য হিসেবে বহাল রাখার ঘটনা শুধু প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনাই নয়, বরং সমবায় কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও বৈধতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এ ছাড়া একই ব্যক্তি একাধিক মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটিতে সদস্য বা পদাধিকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ সমবায় সমিতি আইন, ২০০১ (সংশোধিত)-এর পরিপন্থী বলে আবেদনকারী দাবি করেছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রতি অর্থবছরে বাধ্যতামূলক অডিট সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও মৃত সদস্যদের নাম তালিকায় বহাল থাকার ঘটনা অডিট কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা পর্যায়ের কিছু অসাধু চক্রের সহায়তায় ভুয়া বা প্রশ্নবিদ্ধ সমিতি গঠন ও নিবন্ধন দেওয়ার মাধ্যমে সমবায় ব্যবস্থাকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সমবায়ের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আবেদনকারী সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলোর নিবন্ধন বাতিল, অবৈধ ব্যবস্থাপনা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা, নতুন মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নিবন্ধন কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত, বিশেষ নিরীক্ষা পরিচালনা এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
মৃত ব্যক্তির নাম সদস্য তালিকায় থাকা এবং সমিতিগুলোর বিষয়ে নাচোল উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান হোসেন আকন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সদস্য তালিকায় মৃত ব্যক্তিদের নাম রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই। তবে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতেই নিবন্ধন প্রদান করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে যদি কোনো ধরনের জালিয়াতি প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট সমিতির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং প্রয়োজন হলে সমিতির নিবন্ধন বাতিল করা হবে।
অন্যদিকে, জেলা সমবায় কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মো. মুকলেসুর রহমান অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘এ বিষয়ে সমিতির সভাপতি ও উপজেলা সমবায় কর্মকর্তাকে প্রায় দুই মাস আগে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছিল। সে সময় জানানো হয়েছিল যে মৃত ব্যক্তিদের নাম সদস্য তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে যদি তা না হয়ে থাকে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে সমিতির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে অভিযোগকারী ও স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, নিবন্ধন প্রদানের সময় যথাযথ যাচাই-বাছাই করা হলে মৃত ব্যক্তি বা অযোগ্য সদস্যদের নামে সমিতি পরিচালনার সুযোগ থাকার কথা নয়। তাদের অভিযোগ, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সমবায় কর্মকর্তাদের দায়িত্বে গাফিলতি কিংবা যোগসাজশের কারণেই এসব অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে বহাল রয়েছে। এমনকি কেউ কেউ অর্থের বিনিময়ে প্রশ্নবিদ্ধ সমিতির নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
স্থানীয়দের মতে, বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, সমিতির দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
আব্দুল আজিজ/রিফাত/