মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য জ্বালানিসংকটের আশঙ্কায় রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা পরিহারের জন্য স্পষ্ট নিদের্শনা দেওয়া হয়েছে। তবে সেই নির্দেশনা মানার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না চট্টগ্রামের বহু মার্কেট ও শপিং সেন্টারে। সন্ধ্যা হলেই জ্বলে উঠছে রঙিন বাতি, ঝলমলে লাইট ও নান্দনিক আলোকসজ্জা। কোথাও মার্কেটের পুরো ভবন, কোথাও পার্কিং এলাকা ও খোলা জায়গা পর্যন্ত সাজানো হয়েছে রঙিন আলোয়। এতে একদিকে বাড়ছে জ্বালানি খরচ, অন্যদিকে ঘটছে বিদ্যুতের অপচয়, যা সংকটের আশঙ্কার সময়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন শহরের মার্কেট ও শপিং সেন্টারগুলোতে প্রতি বছরই উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর রঙিন লাইট, এলইডি স্ট্রিং, নকশা করা আলোকসজ্জা ও গেট ডেকোরেশনের মাধ্যমে মার্কেট এলাকা জমজমাট হয়ে ওঠে। দেশের অন্যান্য স্থানের মতো চট্টগ্রামের বড় বড় মার্কেটেও ঈদ সামনে রেখে দোকানের সামনে রঙিন বাতি ও ব্যানার টাঙানো হয়েছে। এতে রাতের বেলায় বাজার এলাকায় তৈরি হয়েছে আলাদা উৎসবের আমেজ। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে ক্রেতাদের ভিড়। শুধু দোকান বা ভবনই নয়, মার্কেটের সামনে পার্কিং এলাকা, খোলা জায়গা এমনকি আশপাশের সড়কও বাদ যাচ্ছে না লাইটিং থেকে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক মার্কেটে ব্যাপক আলোকসজ্জা করা হয়েছে। জিইসি মোড়ের সানমার শপিং সেন্টারের পুরো ভবনজুড়ে লাইটিং রয়েছে। ভবনের সামনের পার্কিং এলাকাতেও অতিরিক্ত লাইটিং লাগানো হয়েছে। প্রবর্তক মোড়ে মিমি সুপার মার্কেট, আফমি প্লাজা এবং লালখান বাজারের আমিন সেন্টারেও দেখা গেছে একই চিত্র। আগ্রাবাদের সিংগাপুর মার্কেট ও আগ্রাবাদ সেন্টার রঙিন বাতি দিয়ে সাজানো হয়েছে।
সন্ধ্যার পর নগরীর নিউ মার্কেট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, জিইসি মোড় ও চকবাজারসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকায় ঘুরে দেখা যায়- অধিকাংশ দোকান ও মার্কেটে ঈদ উপলক্ষে বিপুল পরিমাণ আলোকসজ্জা করা হয়েছে। অনেক দোকানের সামনে বৈদ্যুতিক সাজসজ্জা করে ক্রেতাদের আকর্ষণ করার চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ী।
অন্যদিকে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের বিষয়টি মাথায় রেখে ব্যবসায়ীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘রমজান ও ঈদ উপলক্ষে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা থেকে বিরত থাকতে হবে।’ তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গেও যুক্ত। তাই সংকটের সময়ে বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো হবে।’
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একইভাবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রও একাধিকবার জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়ে তাগিদ দিয়েছেন।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদকে সামনে রেখে ক্রেতা আকর্ষণে আলোকসজ্জা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই পুরোপুরি আলো বন্ধ করা তাদের পক্ষে কঠিন। অনেকেই দাবি করছেন, ব্যবসার স্বার্থে কিছুটা আলোকসজ্জা রাখতে হচ্ছে, যদিও তারা বিদ্যুৎ অপচয় কমানোর চেষ্টা করছেন।
চট্টগ্রাম শপিং কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এমরান বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনাকে আমরা সম্মান করি। যতটা সম্ভব বিদ্যুৎ কম ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ঈদকে সামনে রেখে ব্যবসাও চালিয়ে যেতে হবে। মার্কেট সুন্দরভাবে সাজানো না থাকলে অনেক সময় ক্রেতারা আগ্রহ দেখান না।’
মিমি সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন কাঞ্চন বলেন, ‘রমজান উপলক্ষে কিছুটা সাজসজ্জা না থাকলে আকর্ষণ কমে যায়। ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই আলোকসজ্জা করা হয়েছে। রমজান শেষ হলে এসব আলোকসজ্জা আর থাকবে না।’ তিনি বলেন, বছরের ব্যবসার বড় একটি অংশই হয় ঈদকে কেন্দ্র করে। অন্য সময় ব্যবসা তুলনামূলক কম থাকে। তাই রমজানের সময় কিছুটা ব্যবসা না হলে অনেক ব্যবসায়ী টিকে থাকতে পারবেন না।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সরকার জ্বালানি তেলের ব্যবহার ২৫ শতাংশ কমানোর ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে যানবাহনের জন্য ফিলিং স্টেশনগুলোতে রেশনিং পদ্ধতিতে কম তেল সরবরাহ শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযমের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।