আলু চাষে ক্রমাগত লোকসান এবং তামাক কোম্পানিগুলোর সহজলভ্য ঋণ ও বীজ সহায়তার কারণে রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা তামাক চাষে ঝুঁকছেন। দ্বিগুণ লাভের আশায় এবং কোম্পানি থেকে আগাম সুবিধার প্রলোভনে পড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জমির উর্বরতা হ্রাসের আশঙ্কা জেনেও তারা তামাক চাষে ব্যাপক উৎসাহ দেখাচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) এ ব্যাপারে কথা হয় রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে। তারা জানান, এক কেজি আলু ফলাতে খরচ হয় ১৫ থেকে ১৮ টাকা। বিক্রি করে লোকসান হয় ১০ থেকে ১২ টাকা। অন্যদিকে এক কেজি তামাক ফলাতে খরচ হয় ৭৫ থেকে ৮০ টাকা, যা বিক্রি হয় ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। যাতে কেজিতে লাভ থাকে ১০০ থেকে ১২০ টাকা।
তামাক কোম্পানিগুলো চাষিদের বীজ, সার, কীটনাশক এবং সুদমুক্ত ঋণের সুবিধা দেয়। এ ছাড়া কোম্পানিগুলো মাঠ থেকেই সরাসরি তামাক কিনে নেয়, যা কৃষকদের জন্য খুব সুবিধাজনক।
এদিকে দুই তিন বছর ধরে আলুর দাম না থাকায় বাড়িতে পচে যাচ্ছে বা হিমাগারে রাখতে হচ্ছে। ফলে দ্বিগুণ লোকসানের শিকার হচ্ছেন কৃষকরা। এই লোকসান থেকে রেহাই পেতে ঝুঁকি জেনেও তামাক চাষে ঝুঁকছেন তারা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম জেলায় তামাক চাষ হচ্ছে। তবে রংপুর ও লালমনিরহাটে চাষ হচ্ছে বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই অঞ্চলে ২১ হাজার ২৯৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হয়েছিল ১৮ হাজার ৭৩৩ হেক্টর জমিতে।২০২৩-২৪ অর্থবছরে তামাক চাষ হয়েছিল ১৩ হাজার ৩৪৯ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ প্রতিবছরই বাড়ছে তামাক চাষের জমির পরিমাণ।
চলতি বছরে আলু চাষ হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে। গত বছর হয়েছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৩৯ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার ১৮ হাজার ৩৯ হেক্টর কম জমিতে আলু চাষ হয়েছে।
এদিকে, আলু উৎপাদনে কৃষি প্রণোদনার সঠিক ব্যবহার না হওয়া ও কৃষি দপ্তরের সঠিক পরামর্শ না পাওয়ার বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন কৃষকরা। সম্প্রতি কথা হয় লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষক সুজা মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, প্রতিবছরই আলু আবাদ করে ধরা খেতে হয়। গতবারের আলু হিমাগারেই নষ্ট হওয়ার পথে রয়েছে। উৎপাদন খরচ বেশি। তাই গত বছর দুই একর জমিতে আলু আবাদ করলেও এ বছর ওই দুই একর জমিতে তামাক চাষ করেছি। ফলে কোনো ধরনের ঝুঁকি ছাড়াই লাভের আশা করছি।
রংপুর সদরের পাগলাপীর এলাকার কৃষক সামাদ মিয়া বলেন, ‘তামাক উৎপাদনে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেই বরং উল্টো কৃষিঋণ থেকে শুরু করে বিনা সুদে বীজ পর্যন্ত কোম্পানি দেয়। আবার রোগ-বালাই কম হওয়ায় ঝুঁকি ছাড়াই আবাদ করা যায়, তাই মানুষ আর আলু আবাদ করে না। আমিও তামাক চাষ করছি। তামাকের লাভের টাকায় সস্তায় আলু কিনে খাওয়া যাবে।’
অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্সের (আত্মা) সদস্য খোরশেদ আলম বলেন, ‘মানুষ মাত্রই লাভ করতে চায়। তাই কৃষকরা ঝুঁকে পড়ছেন লাভবান ফসলের দিকে। তামাকে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকলেও কৃষকরা লাভবান মনে করে চাষাবাদ কমাচ্ছেন না বরং বাড়িয়ে দিচ্ছেন। আলু ভুট্টায় টানা লোকসানের কারণে তামাকের চাষাবাদ দিন দিন বাড়ছে। আলু ভুট্টার সরকারি মূল্য ও বাজার সৃষ্টি করলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পেলে তামাক ছেড়ে বিকল্প ফসল হিসেবে আলু বা ভুট্টার চাষে ফিরবে কৃষকরা। এ জন্য সরকারের সদিচ্ছার প্রয়োজন।’
রংপুর বিভাগীয় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সফিনুর রহমান বলেন, ‘তামাক চাষে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে মাটির। মাটিতে অনুজীবগুলো ভেঙে যাচ্ছে ফলে জৈব কোনো স্যার উৎপাদন হচ্ছে না। সেখানে কেঁচো পর্যন্ত এখন আর মাটিতে নেই। তাই কৃষকদের অন্য ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘সরকার থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি তামাক আবাদি জমির মাটি পরীক্ষা করার। নির্দেশনা পেলে আমরা পরীক্ষা করে দেখতে পারব কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে মাটির।’
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘তামাক চাষ একটা পর্যায়ে স্ট্যাবল অবস্থায় ছিল। গত বছরের তুলনায় এবার বেড়েছে। আমরা চেষ্টা করছি, বিকল্প আবাদে কৃষকদের উৎসাহিত করা যায় কি না।’
রংপুরের সিভিল সার্জন শাহীন সুলতানা বলেন, ‘তামাক শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি করে। বিশেষ করে ফুসফুসের। সে ক্ষেত্রে আমরা সবসময়ই সব মিটিংয়েই বলছি তামাক চাষ না করে অন্য কিছু করা যায় কি না। এখন যেকোনো মূল্যেই হোক কৃষকদের তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করতে হবে।’