কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ইসলাম ধর্ম বিকৃতির অভিযোগ এনে একটি আস্তানায় হামলা চালিয়ে সেখানকার কথিত এক ‘পীরকে’ নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। নিহতের নাম শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর (৫৫)।
শনিবার(১১ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটার দিকে কতিপয় বিক্ষুব্ধ লোকজন উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামের ওই আস্তানায় সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালান। এ সময় বেধড়ক পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় শামীম রেজাকে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, ইসলাম ধর্ম অবমাননা করে শামীম রেজার বক্তব্যের পুরোনো একটি ভিডিও শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে বেশ কিছু লোকজন জড়ো হয়ে ওই হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটান। এ সময় ক্ষুব্ধ লোকজনের হামলায় নিহতের কয়েকজন ভক্ত বা সহযোগীও আহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর এলাকায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। ঘটনার পর এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় অনেকের দাবি, কথিত পীর শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নিজেকে কখনো আল্লাহ, কখনো নবী বা ভগবান বলে দাবি করতেন, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী তথা মুসল্লিদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছিল। এর মাঝে তার একটি পুরোনো ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ঘটনার দিন গতকাল সকালে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও তার আগেই ক্ষুব্ধ লোকজন তার আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন এবং শামীম রেজাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন। পরে উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ বিষয়ে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ভিডিওটি পুরোনো বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভিডিওটি দেখে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ লোকজন তার আস্তানায় ভাঙচুর চালান ও অগ্নিসংযোগ করেন। এ সময় তাকেও বেধড়ক মারধর করা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে শামীম রেজাকে উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরাল পাগলা নামে এক কথিত পীরের দাফন করা লাশ কবর থেকে তুলে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে ফেলেন বিক্ষুব্ধ লোকজন। তার কিছুদিন পর গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস নামে এক শ্রমিককে কারখানা থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার পর বিবস্ত্র করে গাছে ঝুলিয়ে তার লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজবাড়ী বা ময়মনসিংহের ওই ঘটনাসহ মব সৃষ্টি করে কথিত পীর, বাউল-ফকিরদের ওপর হামলা, জোর করে চুল কেটে দেওয়া বা খুন-জখমের মতো বেশ কিছু ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ কুষ্টিয়ার এই ঘটনায় নতুন করে ‘মব সন্ত্রাস’ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
স্থানীয়রা জানান, কুষ্টিয়ার গতকাল নিহত কথিত পীর শামীম রেজা ফিলিপনগর গ্রামের মৃত জেছের আলী মাস্টারের ছেলে। তিনি ঢাকা থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। পরে এলাকায় ফিরে এসে একটি আস্তানা গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে বিতর্কিত ধর্মীয় মতবাদ প্রচার করতে থাকেন। এতে তার কিছু অনুসারী বা ভক্ত তৈরি হয়।
হামলাকারী অনেকেই সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, শামীম রেজা ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলোকে অস্বীকার করে ভিন্নধর্মী মতবাদ প্রচার করতেন। এমনকি অনুসারীদের হজ পালনের জন্য মক্কায় না গিয়ে স্থানীয় একটি বাঁশ বাগানের দরবারে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিতেন। তিনি প্রকাশ্যে পবিত্র কোরআন সম্পর্কেও অবমাননাকর মন্তব্য করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এর আগেও ২০২৩ সালের মে মাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে শামীম রেজার বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় মামলা হয়। সে সময় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছিল। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে তিনি পুনরায় একই ধরনের কর্মকাণ্ড শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় কুষ্টিয়া জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ওই ঘটনায় জড়িত কাউকে এখন পর্যন্ত আটক বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। নিহতের এক ভাইকে পাওয়া গেছে, যাকে দিয়ে মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এরই মাঝে জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া ঘটনার পর বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে।’
এসএন/