নাচ-গাচ, লাঠিখেলা ও অনাবাদি ১৪ রকম শাক দিয়ে ভোজনসহ নানান আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় চৈত্রসংক্রান্তি উদযাপন করা হয়েছে। একই দিন ১৪৩২ বঙ্গাব্দকে বিদায় জানিয়ে ১৪৩৩-কে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন
সিআরবিতে বর্ষবিদায়
বাংলা বর্ষবিদায়ের সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সিআরবি শিরীষতলা প্রাঙ্গণ। চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান গতকাল সোমবার বেলা ৩টা থেকে শুরু হয়ে চলে রাত পর্যন্ত। বর্ণিল সাংস্কৃতিক আয়োজনে গান, নৃত্য, আবৃত্তি ও লোকজ পরিবেশনার মাধ্যমে পুরোনো বাংলা বছরকে বিদায় জানানো হয়।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সম্মিলিত নববর্ষ উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে প্রতিবছরের মতো এবারও এ আয়োজন করা হয়। এতে বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ করা যায়।
সম্মিলিত বাংলা নববর্ষ উদযাপন পরিষদ এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। গতকাল বেলা ৩টায় বর্ষবিদায় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দুই দিনের আয়োজনের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান।
নববর্ষ উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্ব) প্রধান প্রকৌশলী তানভিরুল ইসলাম বলেন, ‘ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেছেন। গান, নৃত্য, আবৃত্তি ও লোকজ পরিবেশনার মাধ্যমে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে সিআরবি প্রাঙ্গণ।’
সুরমা পাড়ে নেচে-গেয়ে বর্ষবিদায়
সিলেটের সুরমা নদীর পাড়ে নেচে-গেয়ে ১৪৩২ বঙ্গাব্দকে বিদায় জানিয়ে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে স্বাগত জানানো হয়েছে। গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় নগরীর চাঁদনী ঘাটে এই বর্ষবিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেট। সংগঠনটির প্রধান পরিচালক শামসুল বাসিত শেরো অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন। সঞ্চালনা করেন বর্ণা ব্যানার্জি। এরপর ছন্দ নৃত্যালয়ের শিল্পীদের ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাওগো এবার যাওয়ার আগে’ গানের সঙ্গে নৃত্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়।
শামসুল বাসিত শেরো বলেন, ‘সিলেটের এই ঐতিহাসিক স্থানে প্রতিবছর আমরা পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাই। আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অনেক পুরোনো ঐতিহ্য এটি। চৈত্রের শেষ দিন বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণ। বাঙালি সংস্কৃতি সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক–এটিই আমাদের চাওয়া। এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হবে দেশি সংস্কৃতি ধারণ করা ও বর্তমান প্রজন্মের কাছে এটা ছড়িয়ে দেওয়া।’
আখড়াবাড়ীতে চৈত্রসংক্রান্তি
কুষ্টিয়ায় নবপ্রাণ আখড়াবাড়ীতে চৈত্রসংক্রান্তি উদযাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৪ রকম অনাবাদি শাক দিয়ে দুপুরের খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে দিনটি পালন করা হয়। এ ছাড়া কৃষকদের উৎপাদিত বিভিন্ন বীজ নিয়ে মেলার আয়োজন করা হয়। গতকাল সকাল ১০টার দিকে কুমারখালীর ছেঁউড়িয়া লালন শাহ মাজারসংলগ্ন নবপ্রাণ আখড়াবাড়ীতে উবিনীগ ও নয়াকৃষি আন্দোলনের আয়োজনে আলোচনা সভার মাধ্যমে দিনের কার্যক্রম শুরু হয়। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশির দিনব্যাপী ছিল নানান আয়োজন।
কুষ্টিয়া সদর, মিরপুর ও কুমারখালীর কৃষকদের উৎপাদিত বীজ নিয়ে সেখানে মেলার আয়োজন করা হয়। তারা একে অন্যের সঙ্গে এসব বীজ বিনিময় করেন। পরে দুপুরে ১৪ রকমের শাক রান্না করে সবার মাঝে পরিবেশন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কুমারখালী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আক্তার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাহিদ সরোয়ার প্রমুখ।
লাঠিখেলা অনুষ্ঠিত
নড়াইলে চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বিকেলে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে শহরের সুলতান মঞ্চে লাঠিখেলার পাশাপাশি অষ্টকগান ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
লাঠিখেলায় অংশ নেওয়া শরীফ আতিয়ার রহমান বলেন, ‘আমার দাদার কাছ থেকে বাবা লাঠিখেলা শেখেন। তার কাছ থেকে আমি শিখি। তারপর আমার থেকে ছেলে। এতে আমাদের কোনো লাভ নেই। শুধু মানুষকে আনন্দ দিয়ে বেড়াই। তবে দিন দিন লাঠিখেলা হারিয়ে যাচ্ছে।’
খেলা পরিদর্শনে আসা জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘লাঠিখেলা ও অষ্টকগান আমাদের সংস্কৃতির অংশ, যা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে লাঠিখেলার আয়োজন করা হয়েছে।’