মাত্র তিন ঘণ্টায় ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম শহর ডুবে যাওয়ার নেপথ্যে ছিল নগরীর দুই খালের ৩০ বাঁধ। নগরীর হিজড়া খাল ও জামালখান খাল খনন এবং সম্প্রসারণ কাজের জন্য শুষ্ক মৌসুমে এই বাঁধগুলো দেওয়া হয়। তাতেই নগরীর প্রবর্তক মোড়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশ, চকবাজার, মুরাদপুর, নাসিরাবাদসহ নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবে যায়। গত মঙ্গলবার সৃষ্ট জলাবদ্ধতা গতকাল বুধবার পর্যন্ত নগরীর কোনো কোনো এলাকায় দেখা গেছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে গতকালের বৃষ্টি।
খোঁজ নিয়ে ও বিভিন্ন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরজুড়ে বর্ষা এলেই পুরোনো আতঙ্ক–জলাবদ্ধতা। অল্প বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যাওয়া, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, নিত্যদিনের কাজকর্মে স্থবিরতা–সব মিলিয়ে নগরবাসীর ভোগান্তি যেন এক অনিবার্য বাস্তবতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী বাঁধ ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নগরবাসীর এই দুর্ভোগ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সিটি মেয়রের মধ্যেও। তিনি জলাবদ্ধতার এমন পরিস্থিতির জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (চউক) দায়ী করছেন। অন্যদিকে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতায় নগরবাসীর চরম ভোগান্তিতে সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মানুষকে এই দুর্যোগ থেকে দ্রুত বের করে আনতে সরকারের চেষ্টা রয়েছে বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রামের সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, হিজড়া খাল ও জামালখান খালে প্রায় ৩০টি অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। এগুলো ধীরে ধীরে অপসারণ করা হচ্ছে। শিট ফাইলগুলোও তুলে নেওয়া হলে পানি দ্রুত নেমে যাবে।
তিনি জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প সড়ক চালু রাখা হয়েছে এবং মেডিকেল কলেজ এলাকার একটি সড়ক খুলে দেওয়া হয়েছে, যাতে যানজট কমে। পাশাপাশি নগরবাসীকে সাময়িকভাবে এই এলাকা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান তিনি।
ক্ষতিগ্রস্ত নগরীর সড়ক
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে জানান, টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার অনেক সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়কে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। অনেক সংস্কারাধীন সড়ক ভেঙে গেছে। এসব সড়কের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।
সড়ক ছাড়াও নগরীর ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানের সঙ্গে লাগায়ো পাহাড়ের রিটেইনিং ওয়ালটি (প্রতিরোধক দেয়াল) ভেঙে গেছে। এ ছাড়া কর্ণফুলী উপজেলায় দেয়াল ধসে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে।
প্রবর্তক মোড়ে ফের জলাবদ্ধতা
গতকাল দুপুরের বৃষ্টিতে নগরীর প্রবর্তক মোড়সহ আশপাশের এলাকার সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। সরেজমিনে দেখা যায়, হাঁটু পানিতে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। পানির কারণে সড়কটিতে যান চলাচল একপ্রকার বন্ধ হয়ে যায়। অনেক গাড়ির ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়তে দেখা গেছে। অনেক দোকানের ভেতর পানি ঢুকে পড়ায় ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েন। প্যান্ট গুটিয়ে কর্দমাক্ত পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে হয়েছে অনেককে। গত মঙ্গলবারের বৃষ্টিতেও এই এলাকায় সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল। সেদিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। ভোগান্তি পোহান রোগী ও স্বজনরা।
এদিকে গতকাল নগরীর পাঁচলাইশ, কাতালগঞ্জ, ঈদগা ও চৌমুহনী এলাকার সড়কে জলাবদ্ধতা দেখা গেছে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও চট্টগ্রামের সভাপতি ছালেহ আহমদ সুলেমান বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষা এলেই আমরা ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে থাকি। কখন বৃষ্টি এসে মালামাল নষ্ট করে দেয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ জাতীয় সংসদে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা তার ওপর আস্থা রাখতে চাই।’
কেন এই জলাবদ্ধতা?
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অধীনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেড খাল খনন, সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় বিভিন্ন স্থানে সাময়িক বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল, যা ভারী বর্ষণে পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
কোথায় কোথায় দেওয়া হয়েছিল বাঁধ?
মূলত হিজড়া খাল ও জামালখান খালে বাঁধের কারণে সংলগ্ন এলাকাগুলোতে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে সিডিএ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কর্মকর্তাদের দাবি। তবে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে খবরের কাগজের প্রতিবেদক দেখেছেন নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির ভেতর দিয়ে যাওয়া খালে অংকুর স্কুল এলাকায় বাঁধ রয়েছে। যার কারণে সোসাইটির পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অবশ্য বাঁধটির আংশিক কাটার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ছাড়া বহদ্দার কাঁচা বাজারের প্রবেশ মুখে বাঁধ দেখা গেছে। সেটিও আংশিক কাটা হলেও পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন হতে পারছে না। এভাবে নগরীর আরও বেশ কিছু এলাকায় খাল সংস্কার ও সম্প্রসারণ কাজের জন্য অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এসব বাঁধের কারণে আশপাশের পানি নিষ্কাশন হতে না পেরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করেছে।
অস্থায়ী বাঁধ অপসারণ
গতকাল সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি নির্দেশ দিলে নগরীর হিজড়া খাল, জামালখান খাল এবং মুরাদপুর বক্স কালভার্ট এলাকায় স্থাপিত অস্থায়ী বাঁধ অপসারণ কাজ শুরু হয়। ফলে প্রবর্তক মোড়, কাতালগঞ্জ, চকবাজার, জামালখান, মুরাদপুর ও বহদ্দারহাটসহ আশপাশের এলাকায় দ্রুত পানি নামতে শুরু করে।
যা বলছেন মেয়র
চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজটি মূলত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) করছে। এই প্রকল্পে সিটি করপোরেশনের সরাসরি কোনো দায়িত্ব নেই। তবে নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই মানুষের পাশে থাকছি এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছি, যাতে নগরবাসীকে দ্রুত স্বস্তি দেওয়া যায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হলে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে আসবে।’ তিনি সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বয় জোরদার করে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেন, যাতে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্ত রাখা যায়।
যা বলছে সিডিএ
জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম খবরের কাগজকে বলেন, মে মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু ভারী বর্ষণ শুরু হওয়ায় এই মৌসুমের কাজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘হিজড়া খালের ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে জামালখান খালের কাজ সামান্য বাকি ছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড চেয়েছিল এই দুই খালের শতভাগ কাজ সম্পন্ন করতে। কিন্তু একদিকে ভারী বৃষ্টিপাত, অন্যদিকে আমাদের সন্তানদের এসএসসি পরীক্ষা চলছে। তাই তাদের অনুরোধ করেছি আর কাজ না করে খালে যত বাঁধ আছে তা কেটে দেওয়ার জন্য। তারা ইতোমধ্যে বাঁধ কাটার কাজ শুরু করে দিয়েছেন।’
তিন বছরের প্রকল্প শেষ হয়নি ৮ বছরেও
২০১৭ সালে অনুমোদিত চট্টগ্রামের খাল পুনর্খনন ও উন্নয়ন প্রকল্পটি তিন বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। অথচ আট বছরেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। বরং দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে এখন ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকায়।
ক্ষোভ নগরবাসীর
নগরীর পাঁচলাইশ এলাকার বাসিন্দা মো. আবু তালেব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাই। সড়কে জমে থাকা বুকসমান ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত পানি শিশু, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষের গায়ে লাগছে। মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে এত বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হলো। লাভ কী হলো’
প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতায় নগরবাসীর চরম ভোগান্তিতে জাতীয় সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। এই সমস্যা সমাধানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সঙ্গে কথা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যত দ্রুত সম্ভব মানুষকে এই দুর্যোগ থেকে বের করে আনতে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৪তম দিন গতকাল চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমানের পয়েন্ট অব অর্ডারে করা এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
জলাবদ্ধতার পেছনে জনসচেতনতার অভাবকে দায়ী করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিভিন্ন ড্রেন ও খালে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিনসহ নানা বর্জ্য ফেলায় পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকার পরিষ্কার করার কয়েক দিনের মধ্যেই আবার ময়লা ফেলে ব্লক করে দেওয়া হচ্ছে। এখানে সব সংসদ সদস্যের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ, আসুন আমরা জনসচেতনতা বৃদ্ধি করি। প্লাস্টিক বা পলিথিন কীভাবে ডিসপোজ করতে হয়, তা জনগণকে শেখাতে হবে। এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’
চট্টগ্রামে আরও চার দিন বৃষ্টির আভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, উত্তর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের বর্ধিতাংশের প্রভাবে এই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিভাগে বৃষ্টির এই প্রবণতা আরও চার দিন অব্যাহত থাকতে পারে। শনিবার পর্যন্ত বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণও হতে পারে।