খুলনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের রোগীদের জন্য চিকিৎসার অন্যতম প্রধান গন্তব্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (খুমেক)। কিন্তু সেখানেই অব্যবস্থাপনা, শয্যাসংকট, জনবল ঘাটতি, দালাল চক্র ও অচল চিকিৎসা সরঞ্জামের কারণে সাধারণ রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন শত শত রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
জানা যায়, ৫০০ শয্যার খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন ১৪০০ জনেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা। এ ছাড়া হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসকের পদ শূন্য থাকায় রোগীরা সময়মতো কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জরুরি বিভাগে বিপুল সংখ্যক রোগীর বিপরীতে চিকিৎসকের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এদিকে হাসপাতালে পোস্ট-অপারেটিভ স্টোরে আগুন লাগায় সেটিও বন্ধ। যার মেরামত কাজ ১২ দিন পরও শুরু হয়নি।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা স্কুলশিক্ষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের খুবই অভাব রয়েছে। দিন-রাতে বিভিন্ন ওয়ার্ডগুলো ইন্টার্ন চিকিৎসকনির্ভর হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। অপর্যাপ্ত অপারেশন থিয়েটার ও অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকের অভাবে অপারেশনের জন্য রোগীদের দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।’
সরেজমিনে দেখা যায়, অতিরিক্ত রোগীর চাপে বাথরুমগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। হাসপাতাল চত্বরে আবর্জনার স্তূপ ও মশার উপদ্রব থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এ ছাড়া হাসপাতালে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য চরম আকারে বেড়েছে। যার ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ রোগীরা প্রতিনিয়ত প্রতারণা ও চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বিভ্রান্ত করে বাইরের নিম্নমানের ক্লিনিকে ও পরীক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে যাচ্ছে চক্রের সদস্যরা। হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ ও বহির্বিভাগকে কেন্দ্র করে এই চক্রের সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা খাবার নিয়েও উঠেছে নানা অভিযোগ। গত শুক্রবার হাসপাতালে রোগীদের পচা, বাসি ও নষ্ট খাবার পরিবেশন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ দিন সরবরাহ করা মুরগির মাংস থেকে পচা গন্ধ পাওয়া যায়। খাদ্যমান ও অব্যবস্থাপনার পেছনে একটি চক্র জড়িত আছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা দীর্ঘদিন ধরেই হাসপাতালটির রান্নাঘর থেকে রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবার বাইরে পাচার করে দেয়। ফলে রোগীরা মানসম্মত খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এদিকে হাসপাতালে পোস্ট-অপারেটিভ স্টোরে আগুন লাগায় যেসব রোগী দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে অস্ত্রোপচারের তারিখ পেয়েছিলেন, তাদের অনেকের অপারেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে গেছে। জানা যায়, আগুনে অপারেশন থিয়েটার এবং পোস্ট-অপারেটিভ ইউনিটের অক্সিজেন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে হাসপাতালে জরুরি এবং চোখের অপারেশন থিয়েটার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া অক্সিজেন বন্ধ থাকায় তা ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে গেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, সময় মতো অস্ত্রোপচার না হওয়ায় অনেক রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছে, কেউ কেউ মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
সার্জারি বিভাগের প্রধান আবু বক্কর সিদ্দিকী বলেন, ‘যে রোগীর আরও এক সপ্তাহ আগে বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল, তার অপারেশন কবে হবে তাও বুঝতে পারছি না। এতে অনেক রোগীর অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।’
হাসপাতালটির পরিচালক ডা. কাজী আইনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা গণপূর্ত অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা অ্যাসেসমেন্ট শেষ হলে শিগগিরি কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন।’
খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হালিম বলেন, ‘আগুনে ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়েছে। শিগগিরই আমরা কাজ শুরু করব। দ্রুত অপারেশন থিয়েটার চালু করতে পারব।’
মাকসুদ রহমান/ খাদিজা রুমি/