গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে চিকিৎসকের অবহেলায় এক প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে একটি ক্লিনিকে, যা সরকারি এক নার্সের নিজ বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছিল। মৃত্যুর পর মরদেহ গোপনে অন্যত্র নেওয়ার চেষ্টা করলে ক্ষুব্ধ স্বজনরা ক্লিনিকে বিক্ষোভ করেন।
শনিবার (১৮ অক্টোবর) ভোরে উপজেলা শহরের নুনিয়াগাড়ী এলাকার ঘোড়াঘাট সড়কে অবস্থিত ‘মা ক্লিনিক অ্যান্ড নার্সিং হোম’-এ এ ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রাতেই ক্লিনিকের পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা পালিয়ে যান। পরে ক্ষুব্ধ স্বজনরা ক্লিনিকে হামলা ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করলে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
নিহত প্রসূতির নাম পারভীন আক্তার পারুল বেগম (২৮)। তিনি পলাশবাড়ী উপজেলার জামালপুর গ্রামের বাদশা মিয়ার মেয়ে ও মহদীপুর ইউনিয়নের বিশ্রামগাছী গ্রামের শামীম মিয়ার স্ত্রী। তার আট বছর ও পাঁচ বছরের দুটি সন্তান রয়েছে।
স্বজনরা জানান, শুক্রবার বিকেলে পারুল বেগমের প্রসববেদনা শুরু হলে সন্ধ্যার দিকে তাকে ওই ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ সিজারের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে অস্ত্রোপচার শুরু করে। অস্ত্রোপচার পরিচালনা করেন পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত নার্স ও ক্লিনিকের মালিক ফাতেমা বেগম, এবং এক অজ্ঞাত চিকিৎসক।
গভীর রাত পর্যন্ত অস্ত্রোপচার চলার পর প্রসূতির শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরই চিকিৎসকরা কাউকে কিছু না বলেই ক্লিনিক ত্যাগ করেন। পরে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ গোপনে প্রসূতি ও নবজাতকের মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এর আগেই মা ও নবজাতক দুজনেই মারা যান।
স্বজনদের সন্দেহ হলে তারা জানতে পারেন, অস্ত্রোপচারের সময়ই প্রসূতি ও নবজাতক মারা গেছেন। খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা ক্লিনিকে ভাঙচুর ও বিক্ষোভ করেন। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মা ক্লিনিকটি মূলত নার্স ফাতেমা বেগমের নিজ বাড়িতে পরিচালিত হয়। তাঁর ভাই এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং তিনিই ক্লিনিকের দেখভাল করেন। এর আগে এখানেও বেশ কয়েকজন প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে একাধিকবার ক্লিনিকটি বন্ধ করা হলেও পরে আবার চালু হয়।
প্রসূতির স্বামী শামীম মিয়া বলেন, 'আমার স্ত্রী একদম সুস্থ ছিলেন। কিন্তু সিজারের সময় চিকিৎসার অবহেলার কারণে নবজাতকসহ তার মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসার নামে তারা মানুষ হত্যা করছে। আমি এর বিচার চাই।'
এ বিষয়ে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুলফিকার আলী ভুট্রু বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে ক্লিনিকটি বন্ধ রয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. রফিকুজ্জামান বলেন, প্রায় পাঁচ মাস আগেও এই ক্লিনিকে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছিল। তখন ক্লিনিকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে শর্ত পূরণের পর পুনরায় চালুর অনুমতি দেওয়া হয়। সর্বশেষ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রফিক/মেহেদী/